শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
বাংলার সাহিত্য ও সমাজচিন্তার পরিসরে মীরাতুন নাহার এমন এক কণ্ঠস্বর, যাঁকে কোনও নির্দিষ্ট পরিচয়ের গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না। তিনি লেখিকা, গবেষক ও দর্শনের অধ্যাপিকা হলেও তার চেয়েও বড় পরিচয়, একজন মানবতাবাদী মানুষ। জন্মসূত্রে মুসলমান পরিবারে জন্ম হলেও ‘মুসলিম নারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার তিনি ঘোর বিরোধী। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত, তা প্রকাশের প্রয়োজন নেই। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন একটিমাত্র শব্দে, মানুষ।
উত্তর ২৪ পরগনার বৌলগাছি গ্রামে নানার বাড়িতে জন্ম নেওয়া মীরাতুন নাহার শিক্ষাজীবন থেকেই কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি কলকাতার ভিক্টোরিয়া কলেজে দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন। যুক্তিবোধ, প্রশ্ন করার অভ্যাস ও মানবিক চিন্তাই তাঁর লেখালেখির ভিত্তি।
মীরাতুন নাহার
প্রবন্ধকার হিসেবে মীরাতুন নাহারের বিশেষ পরিচিতি তাঁর মনীষী-ভাবনায়। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও থেকে শুরু করে সৈয়দ মুজতবা আলী, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রেজাউল করীম, গোপাল হালদার, সমরেশ বসু ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, এই সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধগুলো কেবল সাহিত্য বিশ্লেষণ নয়, বরং সমকাল, সমাজ ও মানবিক দায়ের পাঠ।
একজন নারী লেখক হিসেবে তাঁর কলম কখনও আবেগে ভাসেনি, আবার কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতেও সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজের ভাঙন, মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব এবং সেই দূরত্ব ঘোচানোর দায় তাঁর লেখার বারবার ফিরে আসা বিষয়। রবীন্দ্রনাথের ‘বিকারগ্রস্ততা’ ধারণাকে অবলম্বন করে তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিকতার নামে কীভাবে আমরা সহমর্মিতা ও মূল্যবোধ হারাচ্ছি, যা কোনও ধর্মীয় গণ্ডির বিষয় নয়, বরং এক সর্বজনীন মানবিক সংকট।
এক সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তে মীরাতুন নাহার
নারীর প্রশ্নে মীরাতুন নাহার আপসহীন। নারীর হয়ে, নারীর জন্য তিনি কথা বলেন, তবে তা কোনও সংকীর্ণ পরিচয় রাজনীতির জায়গা থেকে নয়। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল ও মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লেখা তাঁর গ্রন্থগুলি প্রমাণ করে, মুসলিম সমাজের ভেতর থেকেই নারী-স্বাধীনতা, শিক্ষা ও অসাম্প্রদায়িকতার শক্তিশালী ধারা গড়ে উঠেছিল।
রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রশ্নে তাঁর কলম আরও বেশি স্পষ্ট ও নির্ভীক। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ভোটযুদ্ধ ও গণতন্ত্র হত্যার মতো বিষয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলিতে তিনি ক্ষমতার দম্ভ ও নাগরিক অধিকারের সংকটকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন। এখানে তিনি কোনও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নন, বরং একজন সচেতন নাগরিক।
‘সংখ্যালঘু মানবী আমি’ গ্রন্থে তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছেন। তবে সেই অভিজ্ঞতা বিভাজনের দেয়াল তোলে না, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতির পথ নির্মাণ করে। তাঁর কাছে সম্প্রীতি কোনও স্লোগান নয়, বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়ে চর্চিত মানবিক মূল্যবোধ।
একটি সভায় বক্তৃতা দেওয়ার মুহুর্তে মীরাতুন নাহার
অমৃতে বিষে, দেশ কন্যার কলমে, মুসলিম মহিলা মণীষা, আজান, রাজনীতি রাজনীতি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ তাঁর কলম থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদনায় অমূল্য বঙ্গ রতন সন্ধানে ও অন্তঃস্বর উল্লেখযোগ্য। দর্শন চর্চা ও দর্শন চর্যা, ফ্রয়েড জীবন বৃত্তান্ত সহ একাধিক গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
আজ যখন সমাজ বিভাজনের রাজনীতিতে ক্রমশ ক্ষতবিক্ষত, তখন মীরাতুন নাহারের জীবন ও সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ হয়ে ওঠাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। তাঁর কলমের বার্তা স্পষ্ট, সম্প্রীতিই সভ্যতার প্রকৃত মাপকাঠি, আর মানবতাই শেষ সত্য।