ইউনিফর্ম ছেড়ে কলমের জয়: কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় নজির গড়লেন প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান ড. নজরুল ইসলাম
দেবকিশোর চক্রবর্তী
৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় এ বছর পাঠকের ভিড় যেমন চোখে পড়েছে, তেমনই এক বিশেষ নাম ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে আলোচনায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান ড. নজরুল ইসলাম। পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষস্তরে দীর্ঘদিন কাজ করা এই মানুষটি যে একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবেও পাঠকের হৃদয়ে এমন গভীরভাবে জায়গা করে নেবেন, তা হয়তো আগে অনেকেই ভাবেননি। কিন্তু বইমেলার প্রতিটি দিনই প্রমাণ করে দিচ্ছে, এই সাফল্য কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা আর লেখনীর শক্তির স্বাভাবিক ফল।
বইমেলার একাধিক প্রকাশনা সংস্থার স্টল থেকে দেদার বিক্রি হচ্ছে ড. নজরুল ইসলামের বই। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য তাঁর নিজের নামে থাকা স্টলটি। সকাল থেকেই সেখানে পাঠকদের দীর্ঘ লাইন। তরুণ থেকে প্রবীণ, সব বয়সের মানুষ অপেক্ষা করছেন তাঁর লেখা বই সংগ্রহ করতে, কেউ আবার প্রিয় লেখকের হাতে অটোগ্রাফ পাওয়ার আশায়। বইমেলার ভিড়ে এই দৃশ্য যেন আলাদা করে চোখে পড়ছে।
ড. নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় বইগুলির মধ্যে রয়েছে ‘গোয়েন্দা ডায়েরির অজানা পাতা’, ‘অপরাধের অন্ধকারে’, ‘নীরব সাক্ষী’, ‘ইউনিফর্মের আড়ালে মানুষ’ এবং ‘জীবনের জেরা’। এই বইগুলিতে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর কর্মজীবনের নানা অভিজ্ঞতা, অপরাধ জগতের নেপথ্য কাহিনি, প্রশাসনের অন্দরমহলের বাস্তবতা এবং একই সঙ্গে একজন মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দ্বন্দ্ব ও উপলব্ধি। ফলে তাঁর লেখা শুধুই অপরাধকাহিনি নয়, তা এক ধরনের সামাজিক দলিলও।
অনেক পাঠকের মতে, তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হল বাস্তবতা। সেখানে অতিরঞ্জন নেই, নেই কৃত্রিম নাটকীয়তা। একজন পাঠক বললেন, “‘গোয়েন্দা ডায়েরির অজানা পাতা’ পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, যেন কোনও সিনেমা নয়, চোখের সামনে সত্যি ঘটনা ঘটছে।” আর এক পাঠকের বক্তব্য, “‘ইউনিফর্মের আড়ালে মানুষ’ বইটি পড়ে বুঝেছি, একজন পুলিশ অফিসারও কতটা সংবেদনশীল হতে পারেন।”
প্রকাশক মহলেও ড. নজরুল ইসলামের বই বিক্রির সাফল্য আলোচনার বিষয়। এক প্রকাশকের কথায়, “বইমেলায় অনেক নাম আসে, যায়। কিন্তু ড. নজরুল ইসলামের বইয়ের জন্য যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই বিরল। পাঠক তাঁর লেখায় বিশ্বাসযোগ্যতা খুঁজে পান।”
ড. নজরুল ইসলামের রচিত কিছু বইয়ের ছবি
নিজের এই বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ড. নজরুল ইসলাম বরাবরের মতোই বিনয়ী। বইমেলায় বসে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি বলেন, “আমি কোনও বড় সাহিত্যিক হওয়ার দাবি করি না। আমি শুধু আমার দেখা জীবন, আমার কাজের অভিজ্ঞতাই লেখার চেষ্টা করেছি। মানুষ যদি সেই লেখার মধ্যে নিজেদের জীবন, নিজেদের প্রশ্ন খুঁজে পান, তাতেই আমি তৃপ্ত।”
৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ড. নজরুল ইসলামের এই সাফল্য এক গভীর বার্তা বহন করে। পেশা, পরিচয় বা ক্ষমতার গণ্ডি পেরিয়ে যখন একজন মানুষ সত্যি কথা বলেন, তখন পাঠক তাঁকে গ্রহণ করেন। ইউনিফর্ম ছেড়ে কলম হাতে নেওয়া এই প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধানের সামনে বইমেলার দীর্ঘ লাইন যেন সেই কথাই আবেগের সঙ্গে ঘোষণা করে, জীবনের সত্য গল্পের প্রতি পাঠকের ভালোবাসা আজও অটুট।