দেবকিশোর চক্রবর্তী
মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী হাওয়া ক্রমশ জমে উঠছে। আর সেই হাওয়ার কেন্দ্রে এখন একটাই নাম, ডাঃ আব্দুল আজিজ। প্রচারে যেখানেই যাচ্ছেন, সাধারণ মানুষের ভিড়ে প্রায় ঢেকে যাচ্ছেন তিনি। গ্রাম থেকে বাজার, চা-দোকান থেকে পাড়া, সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ঘিরে চোখে পড়ছে প্রবল উচ্ছ্বাস।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কে এই আব্দুল আজিজ? রাজনীতির মূল স্রোতে এতদিন যাঁর নাম খুব একটা শোনা যায়নি, তিনি কীভাবে হঠাৎ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন?
মুর্শিদাবাদের এক অখ্যাত গ্রামের তরুণ চিকিৎসক আব্দুল আজিজ পেশায় ডাক্তার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এলাকার মানুষের কাছে তিনি ‘ডাক্তারবাবু’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। রাজনীতির মঞ্চে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি আগে তেমন ছিল না বললেই চলে।
তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ভাগ্য বদলে যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে লালগোলা কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি ছিল একটি সাহসী এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থাকা একজন ‘নতুন মুখ’কে সামনে এনে দল একপ্রকার জনসংযোগের নতুন রাস্তা খুলে দিয়েছে।
দলের অভ্যন্তরেও জানা যাচ্ছে, আব্দুল আজিজ কার্যত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের প্রার্থী। তাঁর ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাগত পটভূমি এবং জনসংযোগের দক্ষতা, সব মিলিয়ে তাঁকে এই কেন্দ্রের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়েছে।
প্রচারে নেমে সেই আস্থার প্রতিদানও যেন দিতে শুরু করেছেন তিনি। ঝকঝকে স্মার্ট চেহারা, সংযত আচরণ এবং সহজ-সরল ভাষায় মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা, এই তিনটি বিষয় দ্রুত তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অনেকেই বলছেন, “রাজনীতিবিদ নন, মানুষ হিসেবে তিনি বেশি গ্রহণযোগ্য”, আর সেটাই তাঁর বড় শক্তি।
তবে তাঁর নাম ঘিরে বিতর্কও একেবারে নেই, তা নয়। তৃণমূলের বিতর্কিত নেতা এনামুল হক-এর জামাই হিসেবে তাঁর পরিচয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা এই বিষয়টিকেই ইস্যু করতে চাইছে। যদিও সমর্থকদের দাবি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে একজন প্রার্থীর যোগ্যতা বিচার করা ঠিক নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক সত্ত্বেও আব্দুল আজিজ তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে কিছুটা এগিয়েই রয়েছেন। কারণ, তাঁর ‘আউটসাইডার’ ইমেজ এবং ডাক্তার হিসেবে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভোটের ময়দানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এছাড়াও, স্থানীয় মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে, একজন শিক্ষিত ও পেশাদার ব্যক্তি রাজনীতিতে এলে হয়তো এলাকার উন্নয়নে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরিষেবা, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
লালগোলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখা যাচ্ছে, তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তাঁরা মনে করছেন, পুরনো রাজনৈতিক ধ্যানধারণার বাইরে এসে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন আব্দুল আজিজ।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও বসে নেই। তাঁরা সংগঠন শক্তি এবং পুরনো ভোটব্যাঙ্কের ওপর ভরসা রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের ফল কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
তবে এটুকু স্পষ্ট, এই নির্বাচনে লালগোলা কেন্দ্রের অন্যতম চর্চিত মুখ হয়ে উঠেছেন ডাঃ আব্দুল আজিজ। একজন সাধারণ চিকিৎসক থেকে জনতার প্রার্থী হয়ে ওঠার এই যাত্রা ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে রাজনৈতিক মহলের।
এখন দেখার, এই উচ্ছ্বাস ভোটবাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের আসল বিচার হয় ভোটের ফলেই।