সুপ্রিম কোর্টের লড়াই পেরিয়ে ফারাক্কায় কংগ্রেসের জয়: মোতাব শেখের নজিরবিহীন প্রত্যাবর্তন
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী মোতাব শেখ (Motab Shaikh) শুধু একটি আসনে জয় পাননি, তিনি হয়ে উঠেছেন ভোটাধিকার, আইনি লড়াই এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতীক। ব্যবসায়ী পেশার এই প্রার্থী বিজেপির সুধীর চৌধুরীকে ৮ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে কংগ্রেসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দেন।
মোতাব শেখের এই জয়কে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে তাঁর নির্বাচনী লড়াইয়ের আগের আইনি সংগ্রাম। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এর ফলে তিনি শুধু ভোটাধিকারই হারাননি, প্রার্থী হিসেবেও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। অভিযোগ ওঠে, নির্বাচন কমিশন “প্রযুক্তিগত কারণ” দেখিয়ে তাঁর নাম মুছে দেয়, কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দেয়নি।
এই পরিস্থিতিতে মোতাব শেখ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। শীর্ষ আদালত তাঁকে কলকাতার বিশেষ আপিল ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার অনুমতি দেয়। পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি টি. এস. শিবজ্ঞানমের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল তাঁর পাসপোর্ট-সহ নথিকে বৈধ প্রমাণ হিসেবে মেনে নির্বাচন কমিশনকে তাঁর নাম পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। এর ফলে তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রথম প্রার্থী হিসেবে SIR-এ বাদ পড়ার পর আইনি প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল হন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ ফিরে পান।
এই ঘটনায় মোতাব শেখের প্রার্থিতা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে SIR অভিযানে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, যা মোট ভোটারের প্রায় ১১.৯ শতাংশ। বিরোধী দলগুলি এই প্রক্রিয়াকে “অগণতান্ত্রিক”, “অস্বচ্ছ” এবং “গণহারে ভোটাধিকার হরণ” বলে তীব্র সমালোচনা করে। বহু মামলা এখনও বিচারাধীন।
মোতাব শেখের জয় সেই প্রেক্ষাপটে শুধু ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এক প্রতীকী বার্তা। তাঁর মামলায় ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ—শুধু কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে কোনও নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায় না—ভবিষ্যতের বহু মামলার ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে।
ফারাক্কার ফলাফল আরও এক কারণে তাৎপর্যপূর্ণ—এটি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সীমিত সাফল্যের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। যেখানে বৃহত্তর লড়াইয়ে তৃণমূল, বিজেপি ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল প্রবল, সেখানে মোতাব শেখ দেখিয়ে দিলেন সংগঠন, আইনি অধিকার এবং জনসমর্থনের সমন্বয় কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
সব মিলিয়ে, মোতাব শেখের ফারাক্কা জয় ২০২৬-এর বাংলার রাজনীতিতে শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি অধ্যায়।