ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলমের মৃত্যু এক বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের অবসান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 20 d ago
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম
 
শেখ নিজামউদ্দিন 

জ্ঞান, ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের মূলমন্ত্র করে যিনি চিন্তা ও কর্মের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন, সেই ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম আর আমাদের মাঝে নেই। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ভোরে তাঁর শান্ত প্রয়াণ কেবল একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং এক দীর্ঘকাল লালিত আদর্শ, এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন এবং সমাজ পরিবর্তনের এক ধারাবাহিক প্রয়াসেরও অবসান ঘটাল। শিক্ষা, সামাজিক ন্যায় এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তাঁর অবদান ভারত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে যে গভীর ছাপ রেখে গেছে, তা এই শূন্যতাকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে।
 
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম ছিলেন এক দূরদর্শী পণ্ডিত, বিশ্বমুখী চিন্তাবিদ, দক্ষ সংগঠক ও অনুপ্রেরণাদায়ী পথপ্রদর্শক। শিক্ষা, সামাজিক ন্যায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তিনি আজীবন নিবেদিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যু শুধু ভারতের নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও শিক্ষা, সমাজ ও ধর্মীয় জগতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করল।
 
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম
 
১৯৪৫ সালের ৯ অক্টোবর বিহারে জন্মগ্রহণ করেন ড. আলম। তাঁর পিতা ছিলেন এম. আবদুল জলিল। শৈশবকাল থেকেই জ্ঞানার্জন ও সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রবল আগ্রহ তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।
 
তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার সময়েই তিনি উপলব্ধি করেন, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এই উপলব্ধিই তাঁকে ইসলামি সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনৈতিক সংস্কার, সংখ্যালঘু ক্ষমতায়ন এবং জ্ঞানের নৈতিক প্রয়োগের পথে অনুপ্রাণিত করে।
 
ড. আলমের কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত। তিনি সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অবদান রাখেন। পরে তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ বিন সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন, যেখানে তিনি কেবল পাঠদানই নয়, দায়িত্বশীল ও নৈতিক গবেষক হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছেন। মদিনার কিং ফাহাদ কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্সে কুরআন অনুবাদ প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বও তিনি পালন করেন।
 
এছাড়াও তিনি মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ভারতের প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) স্কলারশিপ প্রোগ্রাম কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
 
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম
 
শুধু শিক্ষাবিদ হিসেবেই নয়, তিনি ছিলেন এক নিবেদিত সমাজনেতা ও প্রতিষ্ঠান নির্মাতা। ১৯৮৬ সালে নয়াদিল্লিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইনস্টিটিউট অব অবজেকটিভ স্টাডিজ (IOS)। এই প্রতিষ্ঠানই ছিল তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। গবেষণাভিত্তিক, নৈতিক মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তবমুখী সমাধান প্রদানের মাধ্যমে ভারতীয় মুসলিম সমাজ ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন ছিল এর মূল লক্ষ্য।
 
তাঁর নেতৃত্বে IOS একটি সম্মানজনক থিঙ্ক ট্যাঙ্কে পরিণত হয়, যা গবেষণা প্রকাশনা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার এবং সংলাপ কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজকে নতুন দিশা দেখিয়েছে। ড. আলম বিশ্বাস করতেন, গভীর অধ্যয়ন ও নৈতিক ভিত্তি ছাড়া কোনও সামাজিক আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
 
IOS ছাড়াও তিনি অল ইন্ডিয়া মিল্লি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক, মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন এবং ফিকহ একাডেমি, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস ও ইন্দো-আরব ইকোনমিক কো-অপারেশন ফোরামসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংলাপ, সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তিনি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর চিন্তাভাবনা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতা, ন্যায় ও সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
 
বিশ্বপরিসরে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানও অনস্বীকার্য। অধ্যাপক ইসমাইল রাজি ফারুকি ও ড. আবদুল হামিদ আবু সুলাইমানের মতো বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের সঙ্গে তিনি জ্ঞানের ইসলামিকীকরণ, আন্তধর্মীয় সংলাপ এবং সমকালীন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেন। তিনি দেখিয়েছেন; গভীরতা, উদারতা ও নৈতিকতার সঙ্গে বোঝা হলে ইসলামি চিন্তাধারা আধুনিক বিশ্বের সমস্যারও সমাধান দিতে পারে।
 
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম
 
লেখালেখির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর গ্রন্থ দ্য ফাইনাল ওয়েক-আপ কল মিডিয়ার স্বাধীনতা, বৈশ্বিক বয়ান ও প্রান্তিক কণ্ঠস্বরের মতো বিষয়কে সামনে আনে। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মুসলিমদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, ইসলামি অর্থনীতি, আন্তধর্মীয় বোঝাপড়া ও সামাজিক সংস্কার নিয়ে বহু প্রবন্ধ ও গবেষণাপত্র রচনা করেন। তাঁর লেখাগুলি শুধু সমালোচনামূলক নয়, সমাধানমুখীও ছিল।
 
তবে ড. আলমের সর্বাধিক পরিচয় ছিল একজন শিক্ষক ও মেন্টর হিসেবে। শত শত ছাত্র, গবেষক ও সমাজকর্মী তাঁর সান্নিধ্যে দিশা পেয়েছেন। প্রতিভাকে চিহ্নিত করা, উৎসাহ দেওয়া এবং সঠিক পথে পরিচালিত করাই ছিল তাঁর ব্রত। তাঁর বিনয়, সরলতা ও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সকল মহলে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের সেবায় নিয়োজিত হলেই জ্ঞান অর্থবহ হয়।
 
ব্যক্তিজীবনে ড. আলম ছিলেন সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও নীতিনিষ্ঠ মানুষ। প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ মমতা। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন, যা ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর কাছে নেতৃত্ব মানে ছিল ক্ষমতা নয়, সেবা।
 
ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর আলম রেখে গেলেন জ্ঞান, সংগঠন, নৈতিকতা ও সামাজিক সচেতনতার এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, উপস্থাপিত চিন্তাধারা এবং অনুপ্রাণিত মানুষ আগামী প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে। আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁকে ক্ষমা করেন, জান্নাতে মর্যাদা দান করেন এবং তাঁর মহৎ কর্মের প্রভাব চিরকাল জীবিত রাখেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের পরিবর্তন আসে জ্ঞান, সেবা ও নৈতিক সাহস থেকে।

(লেখক: অল ইন্ডিয়া মিল্লি কাউন্সিলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক)