শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
বাঁকুড়ার লাল মাটির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে যে মেয়েটি বড় হয়েছিল, সে হয়তো তখনও জানত না একদিন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জেলার ঐতিহ্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে। কিন্তু স্বপ্ন, অধ্যবসায় আর শিকড়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। সেই মেয়েটির নাম পত্রলেখা শি।আজ তিনি মুম্বইয়ের ফ্যাশন দুনিয়ার পরিচিত মুখ, খ্যাতনামা সেলিব্রিটি স্টাইলিস্ট। প্রায় দুই দশকের কর্মজীবনে তিনি বিনোদন ও ফ্যাশন জগতের বহু পরিচিত তারকার স্টাইল নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তিনি ভুলে যাননি তাঁর জন্মভূমি, ভুলে যাননি বাঁকুড়ার মাটির গন্ধ, বিষ্ণুপুরের তাঁতঘরের শব্দ কিংবা বাংলার বয়নশিল্পের সৌন্দর্য।
সম্প্রতি ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবের লাল গালিচায় তাঁর উপস্থিতি শুধু একজন স্টাইলিস্টের আন্তর্জাতিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশের এক গর্বের মুহূর্ত। কারণ বিশ্বের ফ্যাশন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিষ্ণুপুরী সিল্ক, বালুচরি ও স্বর্ণচরী বয়নশিল্পকে।যে সময়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মূলত পশ্চিমা পোশাক, বিলাসবহুল ব্র্যান্ড এবং আধুনিক ডিজাইনের দখলে, সেই সময়ে বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন তাঁতশিল্পকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে এক সাহসী পদক্ষেপ। আর সেই সাহসের উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় পত্রলেখার শৈশবে।
বাঁকুড়ার মাটিতে বেড়ে ওঠা পত্রলেখার ছোটবেলা কেটেছে বিষ্ণুপুর অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির আবহে। ছোট থেকেই তিনি দেখেছেন তাঁতিদের অক্লান্ত পরিশ্রম। দেখেছেন কীভাবে এক টুকরো সিল্কের কাপড় ধীরে ধীরে শিল্পকর্মে পরিণত হয়। সূক্ষ্ম নকশা, রঙের ব্যবহার, পৌরাণিক কাহিনির চিত্রায়ণ—সবকিছুই তাঁর শিল্পবোধকে সমৃদ্ধ করেছে।বিষ্ণুপুরের তাঁতশিল্প তাঁর কাছে কখনও শুধু একটি পেশা বা ব্যবসা ছিল না। এটি ছিল তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তাই মুম্বইয়ের ঝলমলে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন নিজের শিকড়ের কাছে। তাঁর বিশ্বাস, বাংলার তাঁতশিল্প শুধু আঞ্চলিক সম্পদ নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য এক অনন্য শিল্পধারা।
কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিষ্ণুপুরী সিল্ককে নতুনভাবে উপস্থাপন করে পত্রলেখা যেন একটি নতুন বার্তা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ঐতিহ্য মানেই পুরনো নয়। সঠিক নন্দনতত্ত্ব, আধুনিক উপস্থাপনা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে শতবর্ষের পুরনো শিল্পও সমসাময়িক ফ্যাশনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।বিষ্ণুপুরী সিল্কের প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে আছে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকথা। সেই গল্পকেই তিনি নতুন স্টাইলের ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ফলে এটি শুধু একটি শাড়ির প্রদর্শনী হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে বাংলার শিল্পঐতিহ্যের বিশ্বজনীন পরিচয়পত্র।

পত্রলেখা নিজেই বলেছেন, বাঁকুড়া থেকে উঠে এসে কানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে পারা তাঁর কাছে অত্যন্ত আবেগের। এই আবেগের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নিজের জেলার কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা, নিজের সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বাংলার শিল্পকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াস।আজ তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটি বিষ্ণুপুরের তাঁতশিল্পীদের সাফল্য, বাংলার হ্যান্ডলুম শিল্পের সাফল্য এবং লালমাটির দেশের মানুষের সাফল্য। যে শিল্পীরা দিনের পর দিন নিভৃতে তাঁতের সামনে বসে সৃষ্টি করে চলেছেন অনবদ্য শিল্পকর্ম, তাঁদের হাতের জাদুকেই বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন পত্রলেখা।
লালমাটির দেশ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ পৌঁছে গেছে কানের লাল গালিচায়। আর সেই যাত্রাপথে পত্রলেখা শি প্রমাণ করে দিয়েছেন, বিশ্বকে মুগ্ধ করতে হলে নিজের পরিচয় বদলাতে হয় না। বরং নিজের শিকড়, নিজের সংস্কৃতি আর নিজের ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরলেই তৈরি হয় সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল গল্প।
পত্রলেখার গল্প তাই শুধু একজন সফল স্টাইলিস্টের গল্প নয়; এটি বাংলার ঐতিহ্যের বিশ্বজয়ের গল্প, বিষ্ণুপুরী সিল্কের নতুন পরিচয়ের গল্প এবং লালমাটির দেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চ জয় করার এক অনুপ্রেরণার কাহিনি।