ইতিহাসের অধ্যাপিকা থেকে সমাজের কণ্ঠস্বর: ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 3 h ago
ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা
ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা
 
বিদুষী গৌর / নয়াদিল্লি

শিক্ষা শুধু পেশা নয়, সমাজ বদলের এক শক্তিশালী মাধ্যম, এই বিশ্বাসকেই নিজের জীবনের দর্শন করে তুলেছেন ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা। শুধু পাঠদান নয়, চিন্তার জগৎকে আলোকিত করাই যেন তাঁর জীবনের লক্ষ্য। ইতিহাসকে বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ, মানবতা এবং সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার এক বিরল ক্ষমতা রয়েছে ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরার মধ্যে। গবেষক, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং সমাজসচেতন কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি আজ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শুধু জ্ঞান নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও উপহার দিচ্ছেন।
 
বর্তমানে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত আত্মা রাম সনাতন ধর্ম কলেজের ইতিহাস বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। গত পনেরোরও বেশি বছর ধরে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজ করে চলেছেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষ শুধু ইতিহাসচর্চার জন্যই পরিচিত নয়, বরং এমন চিন্তাপ্রসূত আলোচনার জন্যও পরিচিত যা অতীতকে বর্তমানের জরুরি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই তাঁর ক্লাসকে এক একটি যাত্রার সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে ইতিহাস জীবন্ত হয়ে ওঠে, প্রশ্নের মূল্য থাকে এবং নীরবতা কখনও বিকল্প নয়।
 

“আমি সবসময় এই পেশায় আসার স্বপ্ন দেখতাম এবং সেই স্বপ্ন পূরণ করেছি, কারণ এটাই শ্রেষ্ঠ পেশা। আমার মা বলতেন, তুমি যদি পড়াও, তবে ভবিষ্যতের বহু দশকের ভিত্তি গড়ে তুলবে। শিক্ষাদান সবচেয়ে মহৎ, সমাজের জন্য সর্বাধিক অবদানকারী এবং আত্মতৃপ্তিদায়ক কাজ। পড়ানোর পাশাপাশি নিজেও শেখা যায়; একজন গবেষকের জন্য এটি সবচেয়ে আনন্দদায়ক পেশা। জাতীয়, বৈশ্বিক এবং মানবিক সেবার জন্য এর চেয়ে ভালো কাজ আর হতে পারে না,” বলেন ডঃ জেহরা।
 
মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ডঃ জেহরার শিক্ষাগত ভিত্তি গড়ে উঠেছে ভারতের দুটি অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। তবে তাঁর বৌদ্ধিক সাধনা কখনও জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মর্যাদাপূর্ণ ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রাম (IVLP) ফেলোশিপ তিনি দু’বার অর্জন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় শিক্ষাজগতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ায় একাধিক একাডেমিক ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ ও বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।
 
তবে ডঃ জেহরার অবদান শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণা সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি লিঙ্গসমতা, নারীর অধিকার এবং সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে এসেছেন। জেন্ডার সেনসিটাইজেশন এবং যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ (POSH) বিষয়ক তাঁর মূল বক্তৃতাগুলি দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। তাঁর বক্তব্যে যেমন গবেষণার গভীরতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে নৈতিক দৃঢ়তা, যা তাঁকে জননীতি ও সামাজিক চেতনা গঠনের আলোচনায় এক সম্মানিত কণ্ঠে পরিণত করেছে।
 
ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা
 
জনসেবার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততায়। তিনি বর্তমানে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর প্রোমোশন অফ উর্দু ল্যাঙ্গুয়েজের ধর্ম ও সংস্কৃতি প্যানেলের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন এবং ভারতের সমৃদ্ধ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে অবদান রাখছেন। এর আগে তিনি ওই সংস্থার ইন্টারনাল কমপ্লেইন্টস কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা রক্ষার জন্য কাজ করেছেন।
 
তাঁর গবেষণা ও জনসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক মর্যাদাপূর্ণ মনোনয়ন পেয়েছেন। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল তাঁকে ঐতিহাসিক রামপুর রাজা লাইব্রেরির প্রকাশনা উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন। এই লাইব্রেরি ভারতের ইন্দো-ইসলামিক বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের অন্যতম মূল্যবান ভাণ্ডার। এছাড়াও জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার উপাচার্য তাঁকে ডঃ কে. আর. নারায়ণন সেন্টার ফর দলিত অ্যান্ড মাইনরিটিজ-এর সেন্ট্রাল রিসার্চ কমিটির বহিরাগত সদস্য হিসেবে নিয়োগ করেছেন, যা তাঁর একাডেমিক বিচারবোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আস্থার প্রতিফলন।
 
একজন লেখক হিসেবেও ডঃ জেহরার প্রভাব ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তৃত। তাঁর লেখা বিশটিরও বেশি একাডেমিক গ্রন্থ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত, যা অসংখ্য ছাত্রছাত্রী ও গবেষকের ভাবনাকে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি অন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক পিএইচডি গবেষণা প্যানেলের সদস্য হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের গবেষকদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং জ্ঞানচর্চার বৈশ্বিক বিনিময়ে অবদান রাখছেন।
 
বিশ্বের আরও ২১টি দেশের মধ্যে শিকাগোতে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করছেন  ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা
 
টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ায় বক্তৃতা দেওয়া থেকে শুরু করে মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল উর্দু ইউনিভার্সিটি, কেরলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কাশ্মীরের একাডেমিক কেন্দ্র এবং দেশের নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ডঃ জেহরা বিভিন্ন শ্রোতৃমণ্ডলীর সঙ্গে নিরন্তর সংযোগ রেখে চলেছেন। তিনি গবেষণাকে সমাজের সঙ্গে সংলাপের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
 
তবে সম্ভবত ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরাকে সবচেয়ে বেশি সংজ্ঞায়িত করে তাঁর পদ, পুরস্কার বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত পরিচয় নয়। বরং তাঁকে সংজ্ঞায়িত করে ভারতের চিরন্তন দর্শন ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস, অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার। বিভাজন ও সংঘাতের এই সময়েও তিনি শিক্ষা, লেখা এবং বক্তৃতার মাধ্যমে মানবতা, সমতা এবং ভাগাভাগি করা ভবিষ্যতের বার্তা ছড়িয়ে চলেছেন।
 
ডঃ সৈয়দ মুবিন জেহরা শুধু কাঁচের ছাদ ভাঙেননি, তিনি সেটিকে একটি দরজায় রূপান্তরিত করেছেন, যে দরজা দিয়ে আজ অসংখ্য মানুষ আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং আশার সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন।