সমীর দি শেখ
কয়েকদিন আগে রাজধানী দিল্লিতে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে প্রশাসনের চালানো এক অভিযানে ব্যাপক চর্চার পাশাপাশি তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যেহেতু প্রশাসন স্থানীয় জনগণকে আস্থায় না নিয়েই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, তাই একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ পাথর নিক্ষেপের মতো সহিংস ঘটনাও ঘটে। কিন্তু এই বিষয়টিকে কেবল পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এখন সময় এসেছে, এই বিষয়টি নিয়ে মুসলিম সমাজের গভীর আত্মচিন্তা করার।
অসমে উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য
যোগাযোগের ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান ভয়
এ ধরনের অভিযান চালানোর সময় প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগের অভাব এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। এর ফলেই এমনকি আইনি পদক্ষেপকেও অনেক সময় “ধর্মীয় আক্রমণ” হিসেবে দেখা হয়, যা ভুয়া গুজব ছড়ানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তথাকথিত “বুলডোজার ন্যায়”-এর প্রচলন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রশাসনের প্রতি আস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
একসময় মহারাষ্ট্রে পুলিশ ও মুসলিম সমাজের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে ‘মোহল্লা কমিটি’ বা সংলাপভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রায় অনুপস্থিত। এর ফলে প্রশাসন ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগের ব্যবধান বাড়ছে এবং গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
যদিও এই অভিযানে কোনো ধর্মীয় স্থাপনা বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবুও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রশ্নটি হলো, অবৈধভাবে দখল করা জমিতে নির্মিত ধর্মীয় স্থাপনা সম্পর্কে ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি কী?
অন্যের সম্পত্তি দখল কোরআনবিরোধী
ইসলাম কোনো অবৈধ বা অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে না। যদি কোনো উপাসনালয় বা মসজিদ অন্যের জমি দখল করে বা সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। ইসলামের ভিত্তিই হলো ন্যায়বিচার। অন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো কোনো নামাজ বা ইবাদত আল্লাহ গ্রহণ করেন না।
অসমে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য
কোরআনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, “তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৮), আরও বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্যায়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৭) এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয়, যদি কোনো মসজিদের ভিত্তি অনৈতিক বা চুরি করা জমির ওপর স্থাপিত হয়, তাহলে সেই মসজিদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা নষ্ট হয়ে যায়।
অবৈধ দখল সম্পর্কে নবী (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী
হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পত্তির অধিকারের বিষয়ে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও কঠোর ছিলেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সামান্য এক টুকরো জমিও দখল করে নেবে, কিয়ামতের দিন তাকে সাত স্তর জমির নিচে ধ্বসিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি ২৪৫২) এই হাদিস যেকোনো পরিস্থিতিতে অন্যের অধিকার হরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে বলা হয়েছে, “আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।” (সহিহ মুসলিম ১০১৫) অনেক ইসলামি চিন্তাবিদের মতে, যদি মসজিদ নির্মাণে ব্যবহৃত জমি বা অর্থ হারাম (অবৈধ) হয়, তবে সেই ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
ইতিহাসের পাতায় ন্যায়পরায়ণ খলিফাদের দৃষ্টান্ত
ইতিহাসেও এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে একটি মসজিদের অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ সেটি এক ইহুদি ব্যক্তির জমিতে অনুমতি ছাড়া নির্মিত হয়েছিল। খলিফার কাছে ওই ইহুদি নাগরিককে ন্যায় দেওয়াই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
অসমে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য
অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ হলো খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ। তাঁর শাসনামলে দামেস্কের বিখ্যাত উমাইয়া মসজিদের একটি অংশ ভেঙে সেই জমি খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কারণ জমিটি জোরপূর্বক অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, ইসলামে ‘হুকুকুল ইবাদ’ (মানবাধিকার) ও ন্যায়বিচার ধর্মীয় স্থাপনার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক চিন্তাবিদ ও শরিয়তের উদ্দেশ্য
আধুনিক যুগেও ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ও ইউসুফ আল-কারদাভির মতো বিশিষ্ট চিন্তাবিদরা বলেছেন, মসজিদ কেবল আইনসম্মত ও নৈতিকভাবে অর্জিত জমিতেই নির্মাণ করা উচিত। জনস্বার্থে বাধা সৃষ্টি করে বা অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা ‘মাকাসিদ আল-শরিয়াহ’, অর্থাৎ শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
আত্মসমালোচনা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন
অতএব মুসলিম সমাজের উচিত আবেগপ্রবণ ও সহিংস প্রতিক্রিয়ার পথে না গিয়ে নবীর সংলাপ ও প্রজ্ঞার নীতি অনুসরণ করা। প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই নিঃসন্দেহে একটি গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু অবৈধ নির্মাণকে “ধর্ম” বলে রক্ষা করা নিজের ধর্মীয় নীতিরই লঙ্ঘন।
বিশেষ করে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। সমাজকে এমন একটি চরিত্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কারও অধিকার ক্ষুণ্ণ করার স্থান থাকবে না। অন্যায় পরিত্যাগ করে সত্য, সংবিধান ও আইনের পথে চললেই আমরা নিজেদের একটি মর্যাদাশীল ও শান্তিপ্রিয় সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।
(লেখক ‘আওয়াজ-দ্য ভয়েস – মারাঠি’-র সম্পাদক।)