আমির সুহেল ওয়ানি
কুরআনকে প্রায়ই এমন এক গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা মুসলমানদের ওপর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে তথাকথিত “ইসলামি রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার দায় চাপিয়ে দেয়। এই ধারণা আধুনিক সময়ে এতটাই প্রচলিত যে অনেকের কাছে তা প্রশ্নাতীত সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু কুরআন ও নবী মুহাম্মদের (সা.) শিক্ষার গভীরে তাকালে দেখা যায়, এই দাবি যতটা সরলভাবে উপস্থাপিত হয়, বাস্তবতা ততটাই জটিল ও সূক্ষ্ম। কুরআনের ভাষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকাঠামোর নির্দেশনা নয়; বরং তা মানুষের নৈতিক বিবেক, ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান।
কুরআনের মূল লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক রূপান্তর সাধন করা। আধুনিক অর্থে “ইসলামি রাষ্ট্র” ধারণাটি মূলত ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও ব্যাখ্যাগত বিকাশের ফল, এটি কুরআনের সরাসরি কোনো আদেশ নয়।
কুরআন নিজেকে সর্বাগ্রে “হুদা” বা পথনির্দেশের গ্রন্থ হিসেবে উপস্থাপন করে, যার উদ্দেশ্য মানবচিত্ত, আচরণ ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বোধ গড়ে তোলা। ঈমান, নৈতিক দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, করুণা ও সামাজিক ভারসাম্য, এই বিষয়গুলোই কুরআনের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য। যদিও কুরআন সামষ্টিক জীবনের নানা প্রসঙ্গ ন্যায়বিচার, পরামর্শ, দান-খয়রাত, চুক্তি, সংঘাত নিয়ে কথা বলে, তবু কোথাও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংবিধান বা রাষ্ট্রতত্ত্বের রূপরেখা দেয় না।
আধুনিক রাজনৈতিক মতাদর্শের মতো কুরআন সার্বভৌমত্ব, ক্ষমতার বিভাজন, ভৌগোলিক সীমানা বা প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থার বিস্তারিত সংজ্ঞা দেয় না। বরং এটি এমন নৈতিক নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করে, যা যেকোনো সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই মানবকর্মকে পথ দেখাতে পারে। রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট মডেল নির্ধারণ না করাটা কাকতালীয় নয়; বরং কুরআনের সার্বজনীন ও কালোত্তীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন, যাতে মুসলমানরা প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তাদের রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলতে পারে, নৈতিক মূল্যবোধে অবিচল থেকে।
রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে আলোচনায় যে আয়াতটি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয় তা হলো, “আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদেরও” (কুরআন ৪:৫৯)। কিন্তু এই আয়াত কোনো রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে না, কিংবা ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের নির্দেশও দেয় না। শাস্ত্রীয় তাফসিরকারেরা “উলুল আমর” শব্দটিকে প্রসঙ্গভেদে শাসক, বিচারক, আলেম বা সমাজনেতা, এভাবে বিস্তৃত অর্থে বুঝেছেন।
এখানে আনুগত্য নিঃশর্ত নয়। একই আয়াতে বিরোধের ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে নৈতিক জবাবদিহির কথাই তুলে ধরে। অর্থাৎ এই আয়াত শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে, কোনো বিশেষ মতাদর্শিক রাষ্ট্রকে নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার কুরআনিক নীতি। “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই” (কুরআন ২:২৫৬), এই আয়াত বিশ্বাসের এক মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে। যখন বিশ্বাস নিজেই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তখন আইন ও রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে ধর্মাচরণ বাধ্যতামূলক করার ধারণা ধর্মতাত্ত্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। কুরআন বারবার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসকে ব্যক্তিগত নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে, যার চূড়ান্ত বিচার পরকালে আল্লাহ করবেন।
“তোমার দায়িত্ব তো কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া” (কুরআন ৪২:৪৮), এই ধরনের আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে নবীজির কাজও ছিল আহ্বান ও বার্তা প্রদান, বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া নয়। ফলে ব্যক্তিগত ধার্মিকতা রাষ্ট্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার দাবি কুরআনের মূল সুরের সঙ্গে খাপ খায় না।
নবী মুহাম্মদের (সা.) জীবনকে প্রায়ই ইসলামি রাষ্ট্রের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, কারণ তিনি মদিনায় আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক, উভয় নেতৃত্বই দিয়েছিলেন। কিন্তু এই নেতৃত্বকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। মদিনা ছিল গোত্রীয় সমাজ, যেখানে বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রয়োজন ছিল। নবীজির রাজনৈতিক ভূমিকা কোনো পূর্বনির্ধারিত ধর্মতাত্ত্বিক নকশা থেকে নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন থেকেই বিকশিত হয়েছিল। মদিনা সনদ, যাকে প্রাথমিক ইসলামি রাজনৈতিক দলিল বলা হয়, ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের (ইহুদি ও পৌত্তলিকসহ) মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত চুক্তি, যেখানে বহুত্ববাদ ও যৌথ নাগরিক দায়িত্ব স্বীকৃত হয়েছিল; কোনো ধর্মীয় একাধিপত্য আরোপ করা হয়নি। সেখানে “ইসলামি রাষ্ট্র” ঘোষণাও ছিল না, ধর্মীয় সমরূপতা চাপানোর চেষ্টাও নয়।
হাদিস সাহিত্য সামাজিক সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের কথা বললেও কোথাও ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট নির্দেশ নেই। বহু হাদিস বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা থেকে সতর্ক করে, স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেয়; আবার একই সঙ্গে জুলুম ও পাপে আদেশ দিলে আনুগত্যের সীমাও নির্ধারণ করে। এখানে গুরুত্ব পায় নৈতিকতা, প্রতিষ্ঠান নয়। নবীজির বাণীতে সততা, দয়া, ন্যায় ও জবাবদিহির কথা বিস্তর এসেছে; কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়নি, যা গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
শাস্ত্রীয় ইসলামি পণ্ডিতেরা শাসনব্যবস্থাকে সাধারণত ধর্মীয় আকিদার স্তম্ভ নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন হিসেবে দেখেছেন। ইমামতি বা খেলাফত নিয়ে আলোচনা হলেও তা ছিল জনশৃঙ্খলা রক্ষা, ন্যায়বিচার কার্যকর করা ও সমাজকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রেক্ষিতে। এসব আলোচনা স্পষ্ট কুরআনিক নির্দেশের চেয়ে ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। যোগ্যতা, নিয়োগপদ্ধতি এমনকি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য একক শাসকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ ছিল, যা প্রমাণ করে, কোনো ঐশীভাবে নির্ধারিত রাজনৈতিক মডেল নিয়ে ঐকমত্য ছিল না। শাসন ছিল উপায় (ওয়াসিলা), লক্ষ্য নয়।
প্রতীকী ছবি
আধুনিক মুসলিম চিন্তাবিদ, যেমন জাভেদ আহমদ ঘামিদি, ফজলুর রহমান, মুহাম্মদ আরকুন ও আবদুল্লাহি আন-নাঈম, জোর দিয়ে বলেছেন, কুরআন রাষ্ট্রকে ধর্ম বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দেয় না। তাদের মতে, শরিয়াহ মূলত ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক ও আইনি দিকনির্দেশনা, রাষ্ট্রক্ষমতার যন্ত্র নয়। ইসলামকে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শে রূপান্তর করলে তা বিশ্বাসকে নৈতিক সাধনা থেকে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থায় নামিয়ে আনে, যা কুরআনের নিয়্যত (অভিপ্রায়) ও নৈতিক নির্বাচনের গুরুত্বকে ক্ষুণ্ণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ন্যায়বিচার, মানব মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকলে মুসলমানরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই বসবাস করতে পারেন।
“ইসলামি রাষ্ট্র” ধারণাটি মূলত বিংশ শতকে উপনিবেশবাদ, পশ্চিমা রাজনৈতিক প্রভাব ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শাসনব্যবস্থার পতনের প্রেক্ষাপটে জোরালো হয়ে ওঠে। ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলো আধুনিক সার্বভৌমত্ব ও আইনের ধারণা ধর্মীয় গ্রন্থে আরোপ করে ইসলামকে একটি সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে কল্পনা করে। ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও এসব মডেল আধুনিক আদর্শিক উদ্বেগের প্রতিফলন, কুরআনের সরাসরি নির্দেশের নয়। তাই এগুলো বহু ব্যাখ্যার একটি, কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কর্তব্য নয়।
সবশেষে বলা যায়, কুরআন মুসলমানদের ওপর কোনো ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধর্মীয় দায় চাপায় না। এটি ন্যায়বিচার, নৈতিক শাসন, পরামর্শ, করুণা ও নৈতিক দায়িত্বের কথা বলে, যা নানা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বাস্তবায়িত হতে পারে। ইসলাম দেয় সৎ জীবনের নীতি, কোনো কঠোর রাজনৈতিক নকশা নয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা মানে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক মতাদর্শকে ঐশী মর্যাদায় উন্নীত করা, যার সমর্থন কুরআন বা সুন্নাহ কোথাও দেয় না। কুরআনের চিরন্তন বার্তা ক্ষমতা বা রাষ্ট্ররূপ নিয়ে নয়; তা বিবেক, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর সামনে জবাবদিহির আহ্বান।