গুয়াহাটি :
অসমের রাজনীতি আবার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি বনাম কংগ্রেস—এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের বাইরে গিয়ে রাজ্যে এক নতুন ঐক্যবদ্ধ বিরোধী মঞ্চ আত্মপ্রকাশ করেছে। কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় দল থেকে দূরত্ব বজায় রেখে গঠিত এই মঞ্চ ইতিমধ্যে ১৬টি দল এক ছাতার নিচে আসার প্রয়াস চলছে সঙ্গে নতুন আরও কয়েকটি দলকে সংযুক্ত করার আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। রাজনীতির অঙ্কে যা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই ঐক্য কি বাস্তব বিকল্প হয়ে উঠবে, না কি এটি আবার বিরোধী রাজনীতির চিরাচরিত ভাঙনের গল্পই লিখবে ?
কেন কংগ্রেস-বিরোধী বিরোধিতা ?
অসমে বিজেপির উত্থানের পর কংগ্রেস ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে—এমন অভিযোগ জাতীয় দল ও আঞ্চলিক ছোট দলের। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), এনআরসি, ভূমি উচ্ছেদ ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থানকে “অর্ধেক প্রতিবাদ, অর্ধেক সমঝোতা” বলেই দেখছে তারা। ফলত বিজেপির বিরোধিতা করতে গিয়েও কংগ্রেসের নেতৃত্বে অনাস্থা থেকেই গেছে।এই প্রেক্ষাপটেই কংগ্রেসের বাইরে একটি ঐক্যবদ্ধ বিরোধী মঞ্চ গঠনের দাবি জোরালো হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করলেও কংগ্রেসের ছায়ায় থাকতে না চাওয়াই এই উদ্যোগের মূল চালিকা শক্তি।
গৌরব গগৈ ফ্যাক্টর ও বিরোধী শিবিরে টানাপোড়েন ।এমন সময় অসম কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ-এর রাজনৈতিক তৎপরতা বিরোধী শিবিরে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিরোধী ঐক্যের অংশ না হয়েও তিনি একাধিক দলের সঙ্গে আলাদা ভাবে যোগাযোগ ও আমন্ত্রণমূলক বৈঠকে বসেছেন।যার মধ্যে অন্তত ৭টি দলের নাম আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি কংগ্রেসের পুরনো কৌশল।বিরোধী ঐক্যকে ভিতর থেকে দুর্বল করা। গৌরব গগৈ আসলে ইন্ডিয়া জোটকে অসমে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন না। তাই এর ফল হয়েছে উল্টো। তার সক্রিয় হওয়ার আগেই একাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক দল ইন্ডিয়া জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।এতে স্পষ্ট— বিরোধী জোটের প্রতি আস্থা অসমে তলানিতে ঠেকেছে।
নতুন মঞ্চের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে দেখা যায় জাতীয় কয়েকটি সহ ১৬ দল নিয়ে গঠিত এই নতুন বিরোধী মঞ্চের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি বিজেপি-কংগ্রেস দ্বন্দ্বের বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা তৈরির চেষ্টা করছে।কংগ্রেস-বিজেপি বিরোধী অবস্থান অসমে নাগরিক সভাগুলোর সিদ্ধান্তের প্রতিফলন বলা যায় । আঞ্চলিক স্বার্থ, জাতিগত পরিচয়, ভূমি ও জীবিকা প্রশ্নকে সামনে এনে তারা জনসমর্থন আদায় করতে চাইছে। যদিও অসমের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, অতীতে একাধিক বিরোধী ঐক্য ভেঙে পড়েছে।
বিজেপির জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হবে সেটাই লাখ টাকার বিষয় ?বিজেপি এখনও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা তাদের হাতে। কিন্তু বিরোধী ভোট যদি তিন ভাগে না ভেঙে এক ছাতার নিচে আসে, তাহলে বহু আসনে বিজেপির অঙ্ক জটিল হতে পারে—বিশেষ করে মধ্য ও নিম্ন অসমে।তবে কংগ্রেস যদি আলাদা ভাবে শক্ত অবস্থান নেয় এবং নতুন বিরোধী মঞ্চের সঙ্গে সমঝোতা না হয়, তাহলে বিজেপিই শেষ পর্যন্ত ভোট বিভাজনের লাভবান হতে পারে -আর সেটাই হবে শেষ কথা ।
আসন্ন অসম বিধানসভা নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি আসলে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের নির্বাচন। ঐক্যবদ্ধ বিরোধী মঞ্চ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামলে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বিকল্প তুলে ধরতে পারে, তাহলে অসমের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। নইলে, এই উদ্যোগও ইতিহাসের পাতায় আরেকটি “সম্ভাবনার অপচয়” হিসেবেই থেকে যাবে।