ড. এম. ডি. মুদাস্সির কামার
ভারত ও আরব বিশ্বের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই সম্পর্কের শিকড় হাজার হাজার বছরের পুরোনো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বাণিজ্যিক আদান-প্রদান এবং মানুষের পারস্পরিক সংলাপের মধ্যে প্রোথিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরব ব্যবসায়ী ও পর্যটকেরা ভারতে আসতেন এবং মালাবার উপকূলের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। তারা ভারতীয় মসলা, লোককথা ও জ্ঞানভাণ্ডারকে বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দেন।
মধ্যযুগেও ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল, যখন বহু ভারতীয় বাণিজ্যিক সম্প্রদায় মাস্কাটে নিজেদের কেন্দ্র স্থাপন করে। ব্রিটিশ শাসনামলে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করতেন এবং অনেকেই মুম্বাইকে তাঁদের বাণিজ্যের কেন্দ্র বানিয়েছিলেন। ভারত ও আরব বিশ্বের অভিন্ন ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় উভয় পক্ষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। এই অভিজ্ঞতাগুলি মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও আলজেরিয়া-সহ আরব বিশ্বের বহু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকেও অনুপ্রাণিত করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (ফাইল ছবি)
ভারতের স্বাধীনতার পর, সদ্য স্বাধীন আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ভারত ধীরে ধীরে কূটনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। শীতল যুদ্ধের সময়কার ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও ভারত-আরব সম্পর্ক বিকশিত হতে থাকে, যখন ভারত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের এক নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়ে মিশর, ইরাক ও সিরিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল বিশেষভাবে দৃষ্টান্তমূলক। ভারত দৃঢ়ভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৮০-র দশকে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় উপসাগরীয় দেশগুলিতে তেল শিল্পে কাজ করতে যান; সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতীয় প্রবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে।
শীতল যুদ্ধোত্তর পর্বে ভারতের বৈদেশিক নীতির পুনর্গঠন আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করে। ‘বিস্তৃত প্রতিবেশ’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। বাণিজ্য, ব্যবসা, তেল আমদানি এবং ভারতীয় শ্রমিকদের অভিবাসন ভারত-উপসাগর সম্পর্কের প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি সমুদ্রদস্যুতা, সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের মতো অভিন্ন হুমকির কারণে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। একবিংশ শতকে ভারত-আরব সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয় এবং একাধিক উচ্চস্তরের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিনিময় ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী সৌদি আরব সফরের এক বৈঠকের দৃশ্য
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনের পর, নয়াদিল্লি আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত ও শক্তিশালী করতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। আগস্ট ২০১৫-তে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদীর কোনও আরব দেশে প্রথম সফর, যা উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর আরব বিশ্বের সঙ্গে গভীর সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা, এবং উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, কৌশলগত, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভারত-আরব সম্পর্ক দ্রুত অগ্রসর হয়।
২০২৫: একটি সংক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত
২০২৫ সাল ভারত-আরব সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই সময়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সফর অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী, বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল একাধিকবার এই অঞ্চল সফর করেন। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি বহু প্রভাবশালী আরব রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক নেতার আতিথ্য করে, যা ভারতের প্রতি আরব বিশ্বের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ
২০২৫ সালে ভারত ও আরব বিশ্বের মধ্যে বহু উচ্চস্তরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২২-২৩ এপ্রিল ২০২৫-এ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সৌদি আরব সফর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ছিল তাঁর তৃতীয় সৌদি সফর (এর আগে ২০১৬ ও ২০১৯)। এই সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ, রাজনৈতিক, কৌশলগত, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। সাংস্কৃতিক সম্পর্কও দৃঢ় থাকে, বিশেষত হজ ও উমরায় বিপুল সংখ্যক ভারতীয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রধানমন্ত্রী মোদী জর্ডন (১৫-১৬ ডিসেম্বর) ও ওমান (১৭-১৮ ডিসেম্বর) সফর করেন। জর্ডনে এটি ছিল তাঁর প্রথম সরকারি সফর, যা ভারত-জর্ডন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তির উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, ভারত-জর্ডন বাণিজ্য মঞ্চে ভাষণ দেন এবং পেত্রার ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর ওমান সফরের একটি দৃশ্য
ওমান সফরও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফরে উভয় দেশ একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) স্বাক্ষর করে, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের দ্বিতীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উচ্চশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ২০২৫ সালে দু’বার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন, জানুয়ারিতে মিডল ইস্ট রাইসিনা ডায়ালগে মূল বক্তব্য রাখার জন্য এবং ডিসেম্বরে ভারত-ইউএই যৌথ কমিশন ও কৌশলগত সংলাপের সহ-সভাপতিত্ব করার জন্য।
২২ এপ্রিল ২০২৫-এ জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা এবং তার পর ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর আওতায় পাকিস্তানে সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে ভারতের অভিযানের পরে, ভারত একাধিক সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল আরব দেশগুলিতে পাঠায়, যারা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত-আরব বাণিজ্য ২২৬.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা ভারতের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৯.৫ শতাংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক ও কাতার ভারতের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে। এপ্রিল ২০২২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আরব দেশগুলি থেকে ভারতে ৩১.৩৪ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আসে, যেখানে ইউএই ও সৌদি আরব অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
উপসাগরীয় দেশগুলিতে কর্মরত ভারতীয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারতে মোট ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স আসে, যার ২৫-৩০ শতাংশ উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। ভারত তার মোট তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ আরব বিশ্ব থেকে পূরণ করে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী সৌদি আরব সফর, জেদ্দায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে স্বাগত জানানোর একটি দৃশ্য
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়। ইউএই, মিশর, সৌদি আরব, ওমান, মরক্কো, জর্ডন ও আলজেরিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা, যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী উদ্যোগ, সাইবার নিরাপত্তা ও মহাকাশের মতো নতুন ক্ষেত্রেও অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পায়।
সাংস্কৃতিক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, ক্রীড়া, পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার হয়। বিপুল সংখ্যক আরব ছাত্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, অন্যদিকে ভারতীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা আরব দেশগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ভারতীয় সিনেমা, সঙ্গীত ও ক্রীড়া আয়োজনের জনপ্রিয়তাও ২০২৫ সালে আরব বিশ্বে আরও বৃদ্ধি পায়।
২০২৫ সালে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারত-আরব সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন এই সম্পর্ককে নতুন শক্তি জুগিয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু, পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাও এখন ভারত-আরব সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সাল ভারত-আরব সম্পর্কের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আরেকটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে।
(ড. এম. ডি. মুদাস্সির কামার, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, সেন্টার ফর ওয়েস্ট এশিয়ান স্টাডিজ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), নয়াদিল্লি)