ইসলাম কি মুক্তিকে সীমাবদ্ধ করে? বিশ্বাসের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনুসন্ধান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 13 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
আমির সুহাইল ওয়ানি

মুক্তির প্রশ্ন--কে মুক্তি পাবে এবং কোন পথে, ধর্মতাত্ত্বিক, সুফি সাধক ও দার্শনিকদের চিন্তাকে যুগে যুগে গভীরভাবে আলোড়িত করে এসেছে। জনপ্রিয় ধর্মীয় আলোচনায় ইসলামকে প্রায়শই একচেটিয়া বা একমাত্রবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন কেবলমাত্র যারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান পরিচয়ে পরিচিত, তারাই মুক্তির অধিকারী। কিন্তু কুরআন, নববী শিক্ষা এবং ইসলামের সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করলে এক ভিন্ন, অধিকতর বিস্তৃত, সূক্ষ্ম ও করুণাময় দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামের কেন্দ্রে রয়েছে আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ), কিন্তু এই একত্ববাদ আল্লাহর রহমতকে কোনো একটি সামাজিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সীমানায় আবদ্ধ করে না। বরং ইসলামী চিন্তায় মুক্তি নির্ভর করে আন্তরিকতা, নৈতিক দায়িত্ববোধ, নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী সত্যের স্বীকৃতি এবং সর্বোপরি আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর।
 
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি কুরআনেই নিহিত। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত আয়াতগুলোর একটি হলো: “নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি, খ্রিস্টান ও সাবিয়ান, যে কেউ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, তাদের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে; তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না” (কুরআন ২:৬২; অনুরূপভাবে ৫:৬৯)।
 
প্রতীকী ছবি
 
এই আয়াতগুলোর তাৎপর্য কেবল অমুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্পষ্ট অন্তর্ভুক্তিতেই নয়, বরং এখানে আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে আল্লাহতে বিশ্বাস, নৈতিক কর্ম এবং পরকালের জবাবদিহিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআন আরও ঘোষণা করে যে আল্লাহ কারও প্রতি অবিচার করেন না এবং কোনো আত্মাকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা দেন না (২:২৮৬)। এর অর্থ হলো, আল্লাহর বিচার মানুষের পরিস্থিতি, সত্যে পৌঁছানোর সুযোগ এবং অন্তরের নিয়ত, সবকিছুকেই বিবেচনায় নেয়।
 
ধর্মীয় বৈচিত্র্যকেও কুরআন আল্লাহর ইচ্ছার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে: “তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমরা নির্ধারণ করেছি এক একটি শরিয়ত ও পথ। আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দ্বারা তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং সৎকর্মে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো” (৫:৪৮)।
 
এখানে ধর্মীয় পার্থক্যকে কোনো দুর্ভাগ্যজনক বিচ্যুতি নয়, বরং নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের এক ঐশী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে: “আমরা কোনো জাতিকে শাস্তি দিই না, যতক্ষণ না তাদের কাছে একজন রাসূল পাঠাই” (১৭:১৫)। অতএব, মুক্তি বা শাস্তি কোনো খেয়ালখুশির বিষয় নয়; তা জ্ঞান, নৈতিক দায়িত্ব এবং আল্লাহর ন্যায়বিচারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
 
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসসমূহও সরল একচেটিয়া ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রহমত তাঁর গজবকে অতিক্রম করে। এক প্রসিদ্ধ হাদিসে আল্লাহ বলেন: “আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পেয়েছে।” নবী এমন মানুষের কথাও উল্লেখ করেছেন, যারা সরাসরি ওহির সংস্পর্শে আসেনি, তবুও নৈতিকতা ও মানবিকতায় উৎকৃষ্ট ছিল, যা ইঙ্গিত করে যে নৈতিক গুণাবলি আল্লাহর কাছে তুচ্ছ নয়। এ প্রসঙ্গে আহলুল ফাত্রাহ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যারা এমন সময় বা স্থানে বসবাস করেছে, যেখানে প্রকৃত ওহি পৌঁছেনি। বহু প্রাচীন আলেমের মতে, এ ধরনের মানুষকে কেবল আনুষ্ঠানিক বিশ্বাসের অভাবে শাস্তিযোগ্য করা হবে না। এই নীতি মুক্তির ধারণাকে আরও সর্বজনীন করে তোলে।
 
প্রতীকী ছবি
 
এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন আবু হামিদ আল-গাজ্জালি। তাঁর ফায়সাল আত-তাফরিকা গ্রন্থে তিনি অমুসলিমদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে পার্থক্য করেন তাদের মধ্যে, যারা সত্য চিনে-বুঝে প্রত্যাখ্যান করেছে, এবং তাদের মধ্যে, যারা কখনোই ইসলামকে সঠিকভাবে জানার সুযোগ পায়নি বা বিকৃত রূপেই জেনেছে। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের তিনি ক্ষমাযোগ্য মনে করেন এবং আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে তাদের মুক্তির সম্ভাবনা স্বীকার করেন। আল-গাজ্জালির মতে, শাস্তির যোগ্যতা নির্ভর করে সচেতন প্রত্যাখ্যানের ওপর, অজ্ঞতা বা পারিবারিক বিশ্বাসের ওপর নয়। এতে ইসলামের সত্যতা অক্ষুণ্ণ থাকে, অথচ মানবজাতির বৃহৎ অংশকে অনন্ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় না।
 
এর চেয়েও বিস্তৃত দার্শনিক-আধ্যাত্মিক দৃষ্টি পাওয়া যায় আন্দালুসীয় সুফি সাধক ইবনে আরাবির চিন্তায়। ওয়াহদাতুল ওজুদ, অস্তিত্বের একত্ব, তত্ত্বের আলোকে তিনি ধর্মীয় রূপগুলোকে একক ঐশী সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিখ্যাত পংক্তি, “আমার হৃদয় সব রূপ ধারণে সক্ষম হয়েছে: তা হরিণের চারণভূমি, আবার সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়”, এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন। তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর চূড়ান্তত্ব অস্বীকার করেননি, কিন্তু তাঁর মতে আন্তরিক উপাসনা, যে রূপেই হোক শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছেই পৌঁছে, কারণ প্রকৃত উপাস্য একমাত্র তিনিই।
 
জালালউদ্দিন রুমি এই সার্বজনীনতাকে দার্শনিক ভাষায় নয়, কবিতার আবেগে প্রকাশ করেছেন। রুমির কাছে বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের রূপান্তর, মতবাদের চেয়ে প্রেম, এবং মুখের চেয়ে হৃদয় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান “এসো, তুমি যে-ই হও” কোনো ধর্মীয় শৈথিল্য নয়, বরং আল্লাহর অসীম করুণার প্রতি গভীর আস্থার প্রকাশ। রুমির দৃষ্টিতে আল্লাহ মানুষের বিশ্বাসের রূপ নয়, বরং আত্মার আকুলতাকে দেখেন।
 
আধুনিক কালে এই চিন্তার ধারাবাহিকতা দেখা যায় ফ্রিথজফ শুয়োঁ, রেনে গেনোঁ এবং সৈয়দ হোসেন নাসরের মতো চিন্তাবিদদের লেখায়। ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই তাঁরা যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রত্যেক ওহিভিত্তিক ধর্ম তার নিজস্ব কাঠামোর ভেতরে পরম সত্য, কিন্তু যে ঐশী সত্য সে প্রকাশ করে, তা সর্বজনীন। শুয়োঁর বাহ্যিক (exoteric) ও অন্তর্নিহিত (esoteric) ধর্মের পার্থক্য এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাহ্যিক স্তরে ইসলাম নিজের পথকে মানদণ্ড হিসেবে ঘোষণা করে; কিন্তু অন্তর্গত স্তরে সে স্বীকার করে যে সব সত্যিকারের ওহির উৎস এক ও অভিন্ন।
 
প্রতীকী ছবি
 
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আপেক্ষিকতাবাদ নয়, কিংবা ইসলামী সত্যের অস্বীকারও নয়। বরং এটি আল্লাহর রহস্যের সামনে মানবিক বিনয় এবং ঐশী ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থার প্রকাশ। কুরআন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়: “তোমাদের প্রতিপালক কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে সেই বিষয়ে বিচার করবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করত” (২২:৬৯)।
 
মানুষের দায়িত্ব সত্যের সাক্ষ্য দেওয়া, বিচারকের আসনে বসা নয়। এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করা যায় না, ইবনে তাইমিয়া এবং পরবর্তীকালে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পুরিতান ও একচেটিয়া ধারার সমালোচনা। এই ধারায় তাওহিদের নামে ইসলামের প্রাচীন নৈতিক, সুফি ও দার্শনিক বহুত্ববাদ সংকুচিত হয়ে পড়ে। মতাদর্শিক কঠোরতা, তাকফিরের প্রবণতা এবং আধ্যাত্মিক গভীরতার অবমূল্যায়ন মুক্তির ধারণাকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে তোলে, এমনকি মুসলিম উম্মাহর ভেতরেও।
 
এর বিপরীতে আল-গাজ্জালি, ইবনে আরাবি, রুমি এবং পরবর্তী চিন্তাবিদদের প্রতিনিধিত্ব করা বৃহত্তর ইসলামী ঐতিহ্য মুক্তির প্রশ্নে বিনয়, গভীরতা ও করুণার পথ অনুসরণ করে। তাঁদের কাছে আল্লাহর রহমত মানবিক শ্রেণিবিভাগে সীমাবদ্ধ নয়, আর চূড়ান্ত বিচার কেবল আল্লাহরই অধিকার।
 
পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম মুক্তিকে কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের দরজায় বন্দি করেনি। এটি একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রা, যা আন্তরিকতা, ন্যায় এবং করুণার দ্বারা পরিচালিত। কুরআনের আল্লাহ রব্বুল আলামিন, সমস্ত জগতের প্রতিপালক। ইসলামের মহৎ সাধক ও চিন্তাবিদরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, সত্য এক হলেও আল্লাহর রহমতের পরিসর অপরিসীম। যেখানে হৃদয় সত্য, কল্যাণ ও একত্বের দিকে আন্তরিকভাবে ধাবিত হয়, সেখানেই মুক্তির সম্ভাবনা বিদ্যমান।