এক সোনালী বিরতি: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
এক সোনালী বিরতি: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব
এক সোনালী বিরতি: প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব
 
 রাজীব নারায়ণ

অর্থনীতি অনেক সময় শুধু সরকার বা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে না; একসময় তা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। মানুষ কী কিনছে, কী ব্যবহার করছে, কোন পণ্য আমদানি করছে, কোথায় খরচ কমাচ্ছে কিংবা দেশের স্বার্থে কোন কেনাকাটা আপাতত স্থগিত রাখছে, এসব ছোট ছোট সিদ্ধান্তই তখন জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।আজ আমরা সেই বিষয় নিয়েই আলোচনা করছি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক সপ্তাহ আগের আহ্বানের প্রেক্ষিতে। তিনি ভারতীয়দের অতিরিক্ত সোনা কেনা এড়াতে, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করতে, জ্বালানি সাশ্রয় করতে এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমাতে অনুরোধ করেছিলেন। প্রথমদিকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনায় বেশ শোরগোল দেখা গেলেও, এখন তা ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে।
 
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের অন্তর্নিহিত অর্থ কী, এবং কেন আজ এটি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আহ্বান ছিল না কোনো জবরদস্তিমূলক নির্দেশ, আবার নাটকীয় ত্যাগ স্বীকারের আবেদনও নয়। বরং এটি এমন এক সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যখন বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা বিভিন্ন অর্থনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অত্যন্ত স্পষ্ট। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে, যেখানে অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়, সেখানে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিটি ধাক্কা বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার, মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর বার্তাটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে একটি দেশের শক্তি শুধু নীতির ওপর নির্ভর করে না, বরং সংকটের সময় সমাজ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপরও নির্ভরশীল।
 
স্বাভাবিকভাবেই সমালোচকেরা এই আহ্বানকে “খুব সামান্য, খুব দেরিতে” (Too little, too late) বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি বহর, বড় বড় কনভয় এবং সরকারি ব্যয়ের যে চিত্র দেখা যায়, তা জনসাধারণের সংযমের আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জনজীবনে প্রতীকী চিত্র অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সব সরকারকেই বুঝতে হবে, সংযমের আহ্বান তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তার সঙ্গে শাসকদের ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতার স্পষ্ট প্রমাণও দেখা যায়। তবে শুধুমাত্র সময় বা উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক থাকলেই এই বার্তার অর্থনৈতিক যুক্তিকে অস্বীকার করা যায় না। কারণ অর্থনীতির সামনে থাকা দুর্বলতাগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়েও বাস্তব।
 
ভারতের সোনার প্রতি আকর্ষণ
 
খুব কম পণ্যই আছে যা ভারতের মানুষের কল্পনা ও আবেগকে সোনার মতো প্রভাবিত করতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সোনা সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, ঐতিহ্য এবং আবেগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। বিয়ে, উৎসব, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের সঙ্গে এটি গভীরভাবে জড়িত। ভারতের আধা-শহর এবং গ্রামীণ অঞ্চলের বহু পরিবারের কাছে সোনা আর্থিক বাজার বা কাগুজে সম্পদের চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
 
তবে অর্থনীতিতে সোনার একটি আলাদা অবস্থান রয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা ভোক্তা হলেও দেশে খুব সামান্য সোনা উৎপাদিত হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি করতে হয়, যার মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ভারতের সোনা আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেড়ে ১৮৬ টনে পৌঁছেছে। ২৪ ক্যারেট সোনার এক টন আমদানি করতে খরচ হয় প্রায় ১,৫২০ কোটি টাকা। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই চাহিদা অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস ও আয় বৃদ্ধির প্রতিফলন। কিন্তু অস্থিরতার সময় অতিরিক্ত আমদানি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে।
 
একজন মহিলা সোনার গয়না পরার দৃশ্য
 
এই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সোনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কও তাদের আর্থিক কৌশলের অংশ হিসেবে ৮৮০ টনেরও বেশি সোনার রিজার্ভ ধরে রেখেছে। কারণ অনিশ্চয়তার সময় সোনার গুরুত্ব বেড়ে যায়, তাই বৈশ্বিক সংকটকালে সাধারণ মানুষের সোনার চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
আমদানির সমীকরণ
 
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান শুধুমাত্র সোনাকে কেন্দ্র করে নয়। এতে জ্বালানি ব্যবহার, বিদেশ ভ্রমণ, ভোজ্য তেল এবং আমদানিকৃত সার, এই বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কারণ এগুলো ভারতের আমদানি ব্যয়ের বড় অংশ। ভারত তার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। তেলের দাম বাড়লেই আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
 
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয়দের বিদেশ ভ্রমণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৩.২৭ কোটি ভারতীয় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, যার ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৩.০৪ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
 
একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে এই প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে, আমদানিকৃত প্রতিটি তেলের ব্যারেল এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই উদ্দেশ্য মানুষের স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে দেওয়া নয়, বরং অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সাময়িক সংযমের বার্তা দেওয়া।
 
তবে সংযম নিয়ে যে কোনো আলোচনায় আরেকটি ভারতের কথাও মনে রাখতে হবে, সেই ভারত, যেখানে রয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিক, দিনমজুর এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। LPG-র উচ্চ মূল্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার খরচ বহু মানুষকে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য করছে। তাঁদের কাছে শহুরে জীবন আর লাভজনক মনে হচ্ছে না। বহু পরিবারের গল্প সামনে আসছে, যারা বাড়িভাড়া, জ্বালানি এবং খাদ্যের ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, অপরিচিত শহরে ক্ষুধা ও অপমান সহ্য করার চেয়ে নিজের গ্রামে কষ্টে থাকা ভালো।
 
পেট্রোল পাম্পে গ্রাহকদের ভিড়ের দৃশ্য
 
এই দৃশ্য অনেককেই কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়কার সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পায়ে হেঁটে গ্রামে ফিরেছিলেন। তাই অর্থনৈতিক সংযমের যে কোনো জাতীয় আহ্বানে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, স্থিতিশীলতার পুরো বোঝা যেন শুধুমাত্র দরিদ্র মানুষের কাঁধে না পড়ে।
 
সম্মিলিত অর্থনীতির শিক্ষা
 
ভারত অতীতেও এমন সময় দেখেছে, যখন অর্থনৈতিক সংযম ছিল জাতীয় প্রয়োজন। ১৯৯১ সালের ব্যালান্স অব পেমেন্টস সংকট আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, কীভাবে বৈদেশিক দুর্বলতা একটি দেশের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদলে দিতে পারে। অবশ্য আজকের ভারত অনেক বেশি শক্তিশালী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার প্রায় ৬৯০ বিলিয়ন ডলার, অর্থনীতি অনেক বড় এবং শিল্পভিত্তিও বহুমুখী।
 
তবে বিশ্ব অর্থনীতি এখন পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত ধাক্কার ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ভারতের জ্বালানির দাম বাড়ায়, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে, আর মুদ্রার ওঠানামা মুহূর্তের মধ্যেই আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
 
এটি শুধু ভারতের ক্ষেত্রেই নয়। জ্বালানি সংকট বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশই নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সাময়িকভাবে সংযমী জীবনযাপনের আহ্বান জানিয়েছে। ভারতও নাটকীয় ত্যাগের কথা বলছে না। তবে এটি মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কোটি কোটি পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত একত্রে জাতীয় অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
 
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ভারতের অর্থনীতির কিছু গভীর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জ্বালানি, ভোজ্য তেল, সার এবং মূল্যবান ধাতুর আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী উত্থানের মাঝেও দুর্বলতার দিকটি স্পষ্ট করে। চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রবৃদ্ধিকে কৌশলগত স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা।
 
সবচেয়ে বড় কথা, এই মুহূর্ত আমাদের আবারও একটি চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দেয়, জাতীয় শক্তি শুধু বোর্ডরুম, মন্ত্রণালয় বা শেয়ারবাজারে গড়ে ওঠে না। এটি গড়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, বাড়িতে, বাজারে, বিমানবন্দরে কিংবা পেট্রোল পাম্পে। ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান এসেছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মবিশ্বাসের শক্তিতে। আর অনিশ্চিত বিশ্বে সেই পথচলা টিকিয়ে রাখতে এখন হয়তো আরও একটি গুণের প্রয়োজন, সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা।
 
(লেখক একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।)