দেবকিশোর চক্রবর্তী
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে আগাম সমীক্ষা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নতুন নয়। বরং প্রতি নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। দেশের একাধিক নামিদামি সমীক্ষক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি-কে এগিয়ে রেখে পূর্বাভাস দিয়েছে ১২০ থেকে ১৬০টি আসন জয়ের সম্ভাবনা। এমনকি কিছু সংস্থা ১৮০ থেকে ২০০ আসন পর্যন্ত অনুমান করেছে। তবে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সমীক্ষার এই অঙ্ক অনেক সময় বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে মেলে না।
এবারের নির্বাচন দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে—প্রথম দফায় ১৫২টি এবং দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। দু’দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশের বেশি, যা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ ভোটদানের হার সাধারণত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে এবং বিরোধী শিবিরের পক্ষে ইতিবাচক বলে ধরা হয়। এই যুক্তি থেকেই অনেকে মনে করছেন যে বিজেপি লাভবান হতে পারে।
তবে বিষয়টি এত সরল নয়। পশ্চিমবঙ্গে গত পনেরো বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের মানুষের মধ্যে একধরনের আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে চালু হওয়া একাধিক জনমুখী প্রকল্প এই আস্থাকে আরও মজবুত করেছে। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’, ‘যুবশ্রী’—এই প্রকল্পগুলি শুধু রাজ্যের মধ্যেই নয়, দেশ ও বিদেশেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিশেষ করে মহিলাদের জন্য ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পেয়ে বহু পরিবার উপকৃত হয়েছে। একইভাবে ‘কন্যাশ্রী’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে, যা নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে চালু হওয়া ‘যুব সাথী’ প্রকল্পও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
অন্যদিকে, সমীক্ষক সংস্থাগুলির একাংশ অভিযোগ তুলেছে যে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে বহু নাম বাদ দিয়েছে, যা শাসকদলের ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এই দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং এর প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল পরিযায়ী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের বাইরে কর্মরত অনেক ভোটার এবার নাগরিকত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে ভোট দিতে ফিরে এসেছেন। তাঁদের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব দিক বিচার করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যদিও বিজেপি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে, তবুও তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সংগঠন, প্রকল্প এবং জনভিত্তির জোরে আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারে। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, এক তৃতীয়াংশ ভোট নিয়েই চতুর্থবার সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে এবারের বঙ্গ নির্বাচন একাধিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে সমীক্ষার পূর্বাভাস, অন্যদিকে মাটির বাস্তবতা—এই দুইয়ের সংঘর্ষই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল। বাংলার ভোটাররা বরাবরই নিজেদের সিদ্ধান্ত দিয়ে চমক দিতে পছন্দ করেন। তাই ফল ঘোষণার আগে কোনও কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সমীক্ষা কতটা সঠিক প্রমাণিত হয়, আর কতটা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।