কলকাতা
আজকের দিনটা শুধুই একটা নির্বাচন ফলাফলের দিন নয়, এ যেন ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দান আজ উত্তাল, প্রতিটি চোখ স্থির হয়ে আছে বিধানসভার সংখ্যার খেলায়। একদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস, দুই শক্তিধর প্রতিপক্ষ মুখোমুখি এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে। নবান্নের করিডোর যেন অপেক্ষা করছে নতুন পদচারণার জন্য। বহু বছরের শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি আসছে এক নতুন অধ্যায়, এই প্রশ্নেই আজ উত্তেজনা চরমে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধুই ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং জনমানসের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে মরিয়া। অন্যদিকে বিজেপি আত্মবিশ্বাসী, তারা মনে করছে, এবার পরিবর্তনের হাওয়া তাদের পক্ষেই বইছে। গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সব জায়গাতেই চলছে একটাই আলোচনা, “নবান্ন কার?” এই লড়াই যেন এক রাজনৈতিক থ্রিলার, প্রতিটি রাউন্ডে বাড়ছে উত্তেজনা, পাল্টাচ্ছে সমীকরণ। কে তুলবেন বিজয়ের পতাকা? কে গড়বেন আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গ?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নরেন্দ্র মোদি (ফাইল)
শেষ পর্যন্ত ফল যা-ই হোক, আজকের এই দিনটি ইতিহাসে লেখা থাকবে এক ‘পাওয়ার চেঞ্জিং স্টোরি’ হিসেবে, যেখানে গণতন্ত্র নিজের শক্তি আর জনতার রায় দিয়ে নতুন দিক নির্দেশ করবে। এক্সিট পোলের ফলাফল ও পূর্বাভাসে স্পষ্ট ইঙ্গিত, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য নয়, নজিরবিহীন ভোটদানের হারেও ইতিহাস তৈরি করল। দু’দফায় সম্পন্ন হওয়া এই নির্বাচনে ভোটারদের বিপুল অংশগ্রহণ নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে, যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এক যুগান্তকারী রেকর্ড।
এই পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি ২০১১ সালের ঐতিহাসিক ‘পরিবর্তনের নির্বাচন’-কেউ ছাপিয়ে গিয়েছে। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। সেই নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ, যা সে সময়ে রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই হারকে প্রায় ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বাংলার ভোটাররা এবার অভূতপূর্ব উৎসাহ নিয়ে বুথমুখী হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত বেশি ভোটদানের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ। শাসক তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, বাম-কংগ্রেস জোট এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটারদের বুথমুখী করেছে। দ্বিতীয়ত, এসআইআর (বিশেষ ভোটার পুনর্বিবেচনা) প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি বিতর্ক ভোটারদের মধ্যে নিজেদের ভোটাধিকার রক্ষার মানসিকতা তৈরি করেছে। ভোটার তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অনেকে এবারের ভোটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকায় স্থানীয় ইস্যু- রাস্তা, কাজ, আবাসন, কৃষি সহায়তা এবং কেন্দ্রীয়-রাজ্য প্রকল্পের সুবিধা, ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
বিরোধীরা দাবি করছে, এই বিপুল ভোটদান “পরিবর্তনের হাওয়া”-র ইঙ্গিত। তাদের বক্তব্য, সাধারণ মানুষ শাসকবিরোধী মনোভাব থেকেই এত বড় সংখ্যায় ভোট দিতে বেরিয়েছেন। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, সরকারের সামাজিক প্রকল্প, মহিলা কল্যাণ কর্মসূচি এবং গ্রামীণ সংগঠনের শক্ত ভিত্তির কারণেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে বেরিয়েছেন। বিজেপির বক্তব্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রচার এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা ভোটারদের উদ্দীপ্ত করেছে। ফলে উচ্চ ভোটদানের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা এখন থেকেই শুরু হয়েছে।
নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, বেশি ভোট মানেই সরাসরি সরকারবিরোধী ভোট, এমন ধারণা সবসময় ঠিক নয়। অতীতে পশ্চিমবঙ্গে বহুবার উচ্চ ভোটদানের মধ্যেও শাসক দল সুবিধা পেয়েছে। আবার কখনও বিরোধীরা লাভবান হয়েছে। তাই শুধুমাত্র ভোটের হার দেখে ফলাফল অনুমান করা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এটা নিশ্চিত যে, উচ্চ ভোটদানের অর্থ ভোটারদের আগ্রহ ও রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন, নবান্নে কি ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ফিরবে, নাকি পরিবর্তনের হাওয়ায় এগিয়ে যাবে ভারতীয় জনতা পার্টি? বিভিন্ন এক্সিট পোল বিজেপির পক্ষে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেও বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম সতর্ক অবস্থান নিয়ে শুধুমাত্র ‘সামান্য এগিয়ে’ থাকার সম্ভাবনার কথা বলছে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর শাসকদলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষ একাধিক এলাকায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক আসনে ভোটারদের মনোভাবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি।
সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ভবানীপুর কেন্দ্রের দিকে, যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার এই কেন্দ্রেও শাসকদলকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজিরবিহীন মোতায়েন। ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর তত্ত্বাবধানে প্রায় ২,৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফলে বহু বছরের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ভোটপর্ব দেখেছে বাংলা বলে দাবি করা হচ্ছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যেখানে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে এবার বড় ধরনের হিংসার ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, অতীতে ভোটের সময় ভয় দেখানো ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা ছিল সাধারণ ঘটনা, তবে এবার কড়া নিরাপত্তার কারণে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে।
নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশনের তরফে লক্ষাধিক সন্দেহভাজন নাম বাদ দেওয়া হয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিরোধীদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপে বহু প্রকৃত ভোটারের নামও বাদ পড়েছে। যদিও কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটদানের দিনের দৃশ্য
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক প্রভাব এবং স্থানীয় স্তরে দলীয় আধিপত্য, এই সমস্ত বিষয় এবারের ভোটে বড় ভূমিকা নিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কিছু আলোচিত অপরাধ ও প্রশাসনিক বিতর্ক শাসকদলের বিরুদ্ধে জনমনে প্রভাব ফেলেছে বলেই মত অনেকের।
এখন সব নজর ৪ মে-র গণনার দিকে। এক্সিট পোল যা-ই বলুক, বাংলার ভোটের চূড়ান্ত রায়ই ঠিক করবে রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নবান্নে কি থাকবে পুরনো শক্তি, নাকি শুরু হবে নতুন অধ্যায়।