দিল্লির রাস্তা থেকে এশিয়ান গেমস: উবার চালক সালমান এখন ভারতের তারকা ক্রীড়াবিদ।

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 15 h ago
সালমান খান
সালমান খান

মালিক আসগর হাশমি / নয়াদিল্লি

হৃদয়ে অটল ইচ্ছা থাকলে স্বপ্ন কখনো ম্লান হয় না। আমেথির এক ছোট্ট গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই যুবক, যিনি একসময় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দিল্লির ব্যস্ত রাস্তায় দিনরাত উবার ট্যাক্সি চালাতেন, তিনিই আজ ভারতীয় সেনাবাহিনীর নৌ দলের সদস্য। ২৯ বছর বয়সী এই যুবক এখন ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে ভারতের হয়ে পদক জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তার গল্পটি রাতারাতি সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাবাকে হারানোর বেদনা, পরিবারের বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার সংগ্রাম, আর্থিক সংকট, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার অপূর্ণ স্বপ্ন এবং অবশেষে এমন একটি খেলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার গল্প, যা তিনি আগে কখনো কল্পনাও করেননি।

সালমান খান উত্তর প্রদেশের আমেঠি জেলার খাইরাহানার অন্তর্গত পুরে ধিংগাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর বাবা, মোহাম্মদ কাসিম খান, হরিয়ানার তাওয়াড়ুতে একজন ট্রাক প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করতেন, যেখানে সালমান তাঁর স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন।

ব্রোঞ্জ পদক জেতার পর সালমান খান ও সতনাম সিং

সালমানের যখন মাত্র ১৮ বছর বয়স, তখন তার বাবা ডেঙ্গুতে মারা যান। হঠাৎ করেই পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। তার ভাইবোনেরা পড়াশোনা করছিল। পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কারণে তাকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়েছিল। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য তিনি দিল্লিতে চলে যান এবং উবার ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন।

দিল্লিতে ট্যাক্সি চালানো সালমানের জন্য শুধু একটি চাকরি ছিল না; সেই সময়ে এটিই ছিল তার পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। তিনি দিনরাত কাজ করতেন, যার ফলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার তার স্বপ্নটা যেন ফিকে হয়ে গিয়েছিল।

এরপর একদিন, ডিউটি ​​শেষে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে ফোন করে। বন্ধুটি তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সেনাবাহিনীর জন্য তার উচ্চতা ও শারীরিক গঠন একদম উপযুক্ত এবং তাকে আবার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করে।

সেই কথোপকথনটি সালমানকে তার পুরোনো স্বপ্নে ফিরে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছিল। সে ট্যাক্সিটি অন্য একজন চালকের হাতে তুলে দিয়ে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রস্তুতির জন্য চার মাস কাটিয়েছিল। সে সফলভাবে নিয়োগ র‍্যালি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ২০১৮ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর, সে পুনের কিরকিতে অবস্থিত বোম্বে ইঞ্জিনিয়ার গ্রুপে (বিইজি) যোগদান করে।

ভিয়েতনামে পদক পাওয়ার মুহূর্ত

নৌকাচালনার এক অপ্রত্যাশিত সূচনা

সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সালমানের জীবন আরেকটি মোড় নেয়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষকরা তার উচ্চতা ও ছিপছিপে গড়ন লক্ষ্য করে তাকে নৌকা বাইচ খেলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

খেলাটি সম্পর্কে সালমান খুব কমই জানতেন। শুরুতে এতে তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে খেলাধুলা তাঁর কাছে কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। তিনি বেশ কয়েকবার রোয়িং থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রশিক্ষকেরা তাঁর সম্ভাবনা বুঝতে পেরে তাঁকে জলে নামিয়ে দেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

তার প্রথম আন্তঃকেন্দ্রীয় নৌকা প্রতিযোগিতায় রৌপ্য পদক জয় সালমানের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল যে, যে খেলাটিকে সে শুরুতে ঘৃণা করত, তাতেও সে অনেক দূর যেতে পারে।

আর্গোমিটারের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করার পর তিনি পুনের সিএমই-ভিত্তিক আর্মি রোয়িং নোডে নির্বাচিত হন, যা ছিল আসল পরিবর্তন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় রোয়ারদের সাথে প্রশিক্ষণ তার জন্য এক নতুন জগতের দরজা খুলে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, রোয়িং শুধু সেনাবাহিনীর একটি কার্যকলাপই নয়, এটি একটি পেশাদার ক্রীড়া জীবনও হতে পারে।
 
 সালমান খান বিদেশে

সাফল্যের নেপথ্যে থাকা পরিবার ও পরামর্শদাতারা


সালমান তাঁর পরিবারকে, বিশেষ করে তাঁর মায়ের দোয়াকে, তাঁর শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস বলে মনে করেন। তাঁর স্ত্রী সাহিবা খাতুনও তাঁর জীবনে গভীর অনুপ্রেরণার উৎস।

তার রোয়িং ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বেশ কয়েকবার তিনি খেলাটি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। সেই কঠিন সময়ে তার প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, মেজর নাগেন্দ্র হুডা, তাকে উৎসাহিত করেছিলেন। আর্মি রোয়িং নোডের কমান্ডিং অফিসার, কর্নেল রামকৃষ্ণনও তাকে ক্রমাগত উৎসাহিত করতেন। অবশেষে, প্রশিক্ষকরা তার প্রতিভা চিনতে পারেন এবং তিনি ভারতীয় জাতীয় দলে নিজের জায়গা করে নিতে সক্ষম হন।

রোয়িং জগতে দ্রুত উত্থান

সালমান খানের সাফল্যের তালিকা দ্রুতগতিতে দীর্ঘ হয়েছে। তিনি গুজরাটে অনুষ্ঠিত ৩৬তম জাতীয় গেমসে স্বর্ণপদক জেতেন। ২০২৩ সালের সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি অলিম্পিয়ান দত্তু ভোকানালকে পরাজিত করে সিঙ্গেল স্কালস ইভেন্টে স্বর্ণপদক জয় করেন। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর তিনি ভারতীয় দলে নিজের জায়গা পাকা করে নেন।

তিনি নিতিন দেওলের সাথে জুটি বেঁধে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০২৪ এশিয়ান রোয়িং কাপে তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক জয় করেন। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নায়েব সুবেদার পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

২০২৫ সালের অস্ট্রেলিয়ান রোয়িং চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২৫ সালের এশিয়ান রোয়িং চ্যাম্পিয়নশিপে প্রাপ্ত রৌপ্য পদক তার এশিয়ান গেমস অভিযানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমস


সালমানের বর্তমান একমাত্র লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমস। তিনি বলরাজ পানওয়ার, সতনাম সিং এবং জাকার খানের সঙ্গে ভারতের পুরুষদের কোয়াড্রুপল স্কালস দলের একজন সদস্য।

এই প্রতিযোগিতায় শুধু ব্যক্তিগত শক্তিই যথেষ্ট নয়। চারজন খেলোয়াড়কেই একটি নির্দিষ্ট ছন্দে নৌকাটি চালাতে হয়। একজন খেলোয়াড়ের একটি ছোট ভুল পুরো নৌকার গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

সালমান খান

সালমানের মতে, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দলের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাস ও সমন্বয় আরও গভীর হয়েছে। তারা একসাথে থাকে, একসাথে প্রশিক্ষণ নেয় এবং নিজেদের দৌড়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে।

২,০০০ মিটার নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় একে অপরের সাথে কথা বলার জন্য খুব কম সময় পাওয়া যায়। স্ট্রোক ম্যান সংক্ষিপ্ত এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলগত নির্দেশনা দেন। কখনও গতি পরিবর্তন করতে হয়, আবার কখনও স্ট্রোকের দৈর্ঘ্য একই রাখতে হয়। বাকি সমন্বয়টুকু নৌকা এবং ফুট স্ট্রেচারের মাধ্যমে করা হয়। সালমান বিশ্বাস করেন যে, যখন চারজন নৌকাচালকই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন, তখন সম্প্রীতি আপনাআপনিই চলে আসে।

ভিয়েতনামে জাসপিন্দর সিংয়ের সাথে ডাবল স্কালসে জেতা রৌপ্য পদকটিও তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পারফরম্যান্স তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল যে তার প্রস্তুতি এশিয়ার শীর্ষ খেলোয়াড়দের সমমানের ছিল।

একটি কঠোর প্রশিক্ষণ সময়সূচী

তার বর্তমান প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো রেসের গতি এবং কৌশলগত নির্ভুলতা। সালমানের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মোটেও সহজ নয়। ভোর ৫টায় তার ওয়াটার ট্রেনিং শুরু হয় এবং এতে প্রায় ২০ কিলোমিটার কৌশলগত ও অ্যারোবিক ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত থাকে। এরপর থাকে সকালের নাস্তা, বিশ্রাম এবং ভিডিও বিশ্লেষণ।

সকাল ১১টায় তিনি তার শারীরিক শক্তি, ক্ষমতা এবং কোর মাসল শক্তিশালী করার জন্য জিমে যান। বিকেলে তিনি ওয়াটার ট্রেনিংয়ের জন্য ফিরে আসেন। সন্ধ্যার প্রশিক্ষণ মূলত স্টার্ট, স্প্রিন্ট এবং রেস পেসের উপর কেন্দ্র করে হয়।

পরবর্তী দুটি কঠিন প্রশিক্ষণ সেশনের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে সে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করে।

রোয়িংয়ে শুধু বাহুর শক্তিই যথেষ্ট নয়। হৃৎপিণ্ডের সহনশীলতা, পায়ের শক্তি এবং কোর স্ট্যাবিলিটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সালমানের প্রশিক্ষণে জিম ওয়ার্কআউট এবং কন্ডিশনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই ধরনের কঠোর পরিশ্রমের সময় তার শরীর প্রতিদিন প্রায় ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ ক্যালোরি শক্তি খরচ করে। তার খাদ্যতালিকায় ওটস, ভাত এবং মিষ্টি আলুর মতো শর্করা জাতীয় খাবার, সেইসাথে ডিম, মুরগির মাংস এবং হো আইসোলেটের মতো প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ সেশনের সময় ইলেক্ট্রোলাইট এবং শক্তি বর্ধক সাপ্লিমেন্টও গ্রহণ করা হয়।

স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)-এর TOPS প্রকল্পের অধীনে তিনি যে সহায়তা পেয়েছেন, তা তাঁকে এই বিশেষ খাদ্যতালিকা এবং সম্পূরকের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে সাহায্য করেছে।

সংগ্রামরত শৈশবের শিক্ষা


সালমান বলেন, জীবনের শুরুর দিকের সংগ্রামগুলোই তাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। ১৮ বছর বয়সে পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ায় তিনি খেলার চাপকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন।

দৌড়ের সময় সে শুধু তার পরিকল্পনার ওপরই মনোযোগ দেয়। অন্য লেনগুলোতে কী ঘটছে তা নিয়ে চিন্তা না করে, সে তার পারফরম্যান্স সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে।

ভারতীয় জার্সি পরাটাও তার জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, একটি সাধারণ গ্রাম থেকে এসে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটা এক বিরাট দায়িত্ব।

সালমান খান

এশিয়ান গেমস থেকে অলিম্পিক পর্যন্ত

এশিয়ান গেমসের পর সালমানের মনোযোগ এখন অলিম্পিকের দিকে। তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে অলিম্পিক কোটা অর্জন করতে এবং ভারতের জন্য একটি অলিম্পিক পদক জিততে চান।

তার এই যাত্রার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তিনি চান, সাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের তরুণ-তরুণীরা তার গল্প থেকে আত্মবিশ্বাস লাভ করুক এবং বুঝুক যে কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাবোধ জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

উবার ট্যাক্সি চালানো থেকে শুরু করে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নৌকা চালানো পর্যন্ত সালমান খানের এই যাত্রা সত্যিই অবিশ্বাস্য। একসময় পারিবারিক দায়িত্বের কারণে খেলাধুলা তাঁর নাগালের বাইরে বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু সেই 'নৌকা চালানো'ই অবশেষে তাঁকে ভারতীয় জাতীয় দলের একজন গর্বিত সঙ্গী করে তোলে।

এখন, জাপানের বিশাল জলরাশিতে তার লক্ষ্য শুধু নৌকাটিকে আরও দ্রুত চালানো নয়; তার প্রধান লক্ষ্য হলো চারজন খেলোয়াড়ের ছন্দ, কৌশল এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে একত্রিত করে বিশ্বমঞ্চে গর্বের সাথে ভারতীয় ত্রিবর্ণ পতাকা ওড়ানো। সালমানের গল্প এখানেই শেষ নয়, এটা তো সবে শুরু। তার আসল পরীক্ষা এখন জলেই শুরু হবে, যেখানে তার স্বপ্নগুলো নতুন গতি পাবে।


শেহতীয়া খবৰ