শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী
উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব আহিরীটোলা সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি এ বার ৮৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কৃতি ও শিল্পের যে ধারক হিসেবে আহিরীটোলা নিজেকে তুলে ধরেছে, সেই ঐতিহ্যকে এ বছর আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে আহিরীটোলা সার্বজনীন দূর্গা উৎসব তাদের মণ্ডপে ফুটিয়ে তুলেছে বাংলার মিষ্টির অতীত এবং সমাজ জীবনের এক অপূর্ব আখ্যান।
বাংলার মিস্টি জাত, ধর্ম ও সামাজিক বিভাজন ভুলে যেভাবে মানুষকে এক সূত্রে গাঁথে, সেই সম্প্রীতির ক্যানভাসকেই মণ্ডপ সজ্জায় ফুটিয়ে তুলছে আহিরীটোলা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর বাণী, ‘বিচিত্রের মধ্যে ঐক্যই ভারতবর্ষের সত্য’, এই থিমের মূল চালিকাশক্তি। অর্থাৎ এবারের আহিরীটোলা সার্বজনীন দুর্গাপুজো ২০২৬-এর মূল ভাবনা বা থিম হলো "বাংলার মিষ্টির ইতিহাস ও ঐতিহ্য"।
পুজো মন্ডপে নানারকম মিষ্টির ছবি আঁকতে ব্যস্ত শিল্পী
কেন মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হবে?
সারা মণ্ডপজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া এবং এখনো জিভে জল আনা হরেক রকমের মিষ্টির বিবর্তন ও ইতিহাস। রসগোল্লা, সন্দেশ থেকে শুরু করে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির গল্প ও তাদের তৈরির নান্দনিক শৈলী মণ্ডপের শিল্পকলায় স্থান পেয়েছে আহিরীটোলা সার্বজনীন দুর্গোৎসবের মন্ডপে।
প্রথমত, কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই পুজো সবসময়ই সমসাময়িক শিল্প ও নস্টালজিয়ার এক দারুণ মিশ্রণ ঘটায়। মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে এই ধরণের গবেষণা ভিত্তিক কাজ প্যান্ডেল হপিং-এ আসা দর্শনার্থীদের শৈশবের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত,গঙ্গার ঘাট সংলগ্ন এই পুজোর ভৌগোলিক অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির মাটি আসে এবং বিসর্জন হয়, সেই ঐতিহাসিক অঞ্চলের পূজা হিসেবে তারা এবার মা দুর্গার আগমনকে মিষ্টিমুখে বরণ করার এক অভিনব বার্তা দিয়েছে।
তৃতীয়ত, সাবেকিয়ানা ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে মায়ের প্রতিমাতেও রয়েছে এক অপরূপ ও অনন্য রূপ, যা প্যান্ডেলের থিমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি।
ঐতিহ্যবাহী উত্তর কলকাতার দুর্গাপুজো পরিক্রমায় যদি আপনি রসনা তৃপ্তি আর ইতিহাসের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখতে চান, তবে আহিরীটোলা সার্বজনীনের মণ্ডপ আপনার অবশ্যই দেখার তালিকায় রাখা উচিত।
পুজো কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা পুজো গুপ্ত বলেছেন, 'আমাদের প্রধান কর্ণধার শ্রী শমীক কুমার সাহার নেতৃত্বে এ বছর আমরা বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির আবহমান ইতিহাসকে তুলে ধরছি। উৎসবের মিষ্টিমুখ কীভাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে পারে, কবিগুরুর সেই সত্যকেই আমরা শিল্পরূপে রূপান্তরিত করছি।'
অর্গানাইজিং সেক্রেটারি গৌরব পণ্ডা বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া মিষ্টির স্বাদ এবং যে কারিগররা রাতদিন পরিশ্রম করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। একটি সাধারণ মিষ্টির দোকান কীভাবে পাড়ার আড্ডার কেন্দ্র ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে ওঠে, তা দর্শনার্থীরা আমাদের মণ্ডপে দেখতে পাবেন।’
এক নজরে উত্তর কলকাতার আহিরীটোলা সার্বজনীন দুর্গা উৎসবের ২০২৬ সালের নতুনত্ব ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:
প্রতিমা শিল্পী: সুব্রত মৃধা দিচ্ছেন শেষ তুলির টান
২০২৬ সালের মূল ভাবনা: বাংলার মিষ্টির ইতিহাস ও ঐতিহ্য
এবার আহিরীটোলার পুজোর মূল থিম বা বিষয়বস্তু হলো "বাংলার মিষ্টির ইতিহাস ও ঐতিহ্য"। বাঙালি আর মিষ্টি একে অপরের পরিপূরক। এই চিরন্তন আবেগকে ছুঁয়েই পুজো কমিটি তাদের মণ্ডপ ওআলোকসজ্জা সাজিয়ে তুলেছে।
ঐতিহ্যের কোলাজ:
রসগোল্লা, সন্দেশ থেকে শুরু করে বাংলার বিভিন্ন জেলার হারিয়ে যাওয়া এবং বিখ্যাত সব মিষ্টির ইতিহাসকে শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের মাধ্যমে মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শিল্পভাবনা:
মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন মিষ্টি তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি, ময়রাদের জীবনযাত্রা এবং বিবর্তনের ইতিহাসকে দারুণভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে।
প্রতিমার রূপ ও নান্দনিকতা:
আহিরীটোলা সার্বজনীন বরাবরই তার সাবেকিয়ানা এবং থিমের মেলবন্ধনের জন্য পরিচিত। ২০২৬ সালের পুজোতেও মা দুর্গার প্রতিমার মধ্যে এক অপরূপ এবং অনন্য রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা থিমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দর্শকদের মনে ভক্তি ও শিল্পের এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছে।
আলোকসজ্জা ও পরিবেশ:
মণ্ডপজুড়ে আলোর এমন ব্যবহার করা হয়েছে যা মিষ্টির ইতিহাসের সেই প্রাচীন ও রাজকীয় আবহকে জীবন্ত করে তোলে। উত্তর কলকাতার চন্দননগরের বিখ্যাত আলোকশিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় পুরো এলাকা এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে।
এবারের পুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও খাদ্য-ঐতিহ্যের এক অনন্য দলিল বা প্রদর্শনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।