মুসলিম নারীদের অদেখা গল্প খুঁজতে পাঠক থেকে লেখক সারাহ মেহমুদ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 18 h ago
সারাহ মেহমুদ
সারাহ মেহমুদ
 
সানিয়া আনজুম

কখনও কখনও কোনও গল্পের শুরু হয় তখনই, যখন লেখক নিজেও বুঝতে পারেন না যে তাঁর ভেতরে একটি গল্প জন্ম নিচ্ছে। সারাহ মেহমুদের ক্ষেত্রেও সেই শুরুটা হয়েছিল পড়ার মধ্য দিয়ে। একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ লেখকেরা ধারাবাহিকভাবে তাঁদের উপন্যাস প্রকাশ করতেন। সেই গল্পগুলির জগতে ডুবে যেতে যেতে সারাহ বুঝতে পারেন, সেখানে একটি বিষয়ের ঘাটতি রয়েছে, ভারতীয় প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা মুসলিম চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প, বিশেষ করে এমন গল্প, যেখানে তরুণ মুসলিম নারীদের জীবন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকবে।
 
“আমি ঘটনাচক্রেই লেখালেখির জগতে এসেছিলাম,” স্মৃতিচারণ করেন সারাহ। একজন পাঠকের কৌতূহল থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এমন গল্প তৈরি করার ইচ্ছা, যে গল্প তিনি নিজেই খুঁজে পাননি। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো ছিল না, বরং সেই প্রতিনিধিত্বকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। তাঁর কথায়, “আমি এমনভাবে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চেয়েছিলাম, যা হবে বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক। পাশাপাশি আমাদের সময়ের তরুণীরা যেন এমন চরিত্রের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পান, যাদের তাঁরা অনুসরণ করতে পারেন এবং যাঁদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারেন।”
 
 
এর অর্থ ছিল পরিচিত গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে চরিত্র নির্মাণ করা। সারাহ এমন নারীদের কল্পনা করেছেন, যাঁরা পোশাকে শালীন, নিজেদের স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত এবং একইসঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এমন নারী, যাঁরা কোনও দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করতে পারেন, অথচ শুধুমাত্র সেই পরিচয় দিয়েই তাঁদের সংজ্ঞায়িত করা হয় না।
 
তাঁর লেখায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে তরুণদের সম্পর্ক ও ভালোবাসার বিষয় উঠে আসে। তবে তাঁর চরিত্রগুলি একইসঙ্গে এমন এক সর্বজনীন দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েও এগিয়ে চলে, সমাজ তাঁদের যেমন হতে বলে এবং তাঁরা নিজেদের যেভাবে গড়ে তুলতে চান, সেই দুইয়ের মধ্যে টানাপোড়েন। এই দ্বন্দ্বটি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর বই ‘Bowled Over by the Broken’-এ।
 
বাস্তব জীবনের আরও কাছাকাছি গল্প নিয়ে আসার ইচ্ছা থেকেই বইটির জন্ম। বইয়ের কোনও ঘটনা নিয়ে পাঠকদের বলতে শুনেছিলেন সারাহ, “কিন্তু এগুলো তো শুধু গল্পেই ঘটে।” এই ধারণাটিকেই তিনি বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর কথায়, “পাঠকেরা যদি তাঁদের সময় দিয়ে কোনও বই পড়েন, তাহলে আমি চেয়েছি সেই অভিজ্ঞতাটা যেন অর্থপূর্ণ ও মূল্যবান হয়।”
 
তাই তিনি এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা গল্পে তুলে ধরেছেন, যেগুলির সঙ্গে বহু তরুণ দক্ষিণ এশীয় নারী নিজেদের মিল খুঁজে পেতে পারেন। যেমন গায়ের শ্যামলা বা গমরঙা হওয়া নিয়ে কটূক্তি, পড়াশোনা শেষ করার পরপরই বিয়ের কথা ভাবার জন্য পারিবারিক চাপ এবং বিয়ের পর কোনওভাবে দু’জন মানুষের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হয়ে যাবে, এমন ধারণা। এগুলি কোনও অসাধারণ ঘটনা নয়। আর ঠিক এই কারণেই এগুলি এতটা শক্তিশালী। প্রতিদিনের ছোট ছোট মন্তব্য, প্রত্যাশা এবং পারিবারিক কথোপকথনই নীরবে একজন তরুণীর আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
 
‘Bowled Over by the Broken’ বই এর প্রচ্ছদ
 
সারাহ শুধুমাত্র কোনও রোমান্টিক গল্পের মধ্যে এই বাস্তবতাগুলিকে বসিয়ে দেননি। বরং সম্পর্ক ও বিয়েকে ঘিরে থাকা প্রচলিত ধারণাগুলিকেই প্রশ্ন করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি বিয়েকেই গল্পের শেষ বলে দেখাননি। “বেশিরভাগ গল্পই বিয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়,” তিনি বলেন। “কিন্তু এই বইয়ে বিয়ের পর থেকেই সবচেয়ে ঘটনাবহুল অংশ শুরু হয়।”
 
গল্প বলার ক্ষেত্রে এটি হয়তো একটি ছোট পরিবর্তন, কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক বড়। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হতে পারে, কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় বাস্তব জীবন, সামঞ্জস্য, প্রত্যাশা, মানিয়ে নেওয়া এবং একটি সম্পর্ককে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা। তবে সারাহর তিনটি স্বপ্রকাশিত বইয়ের মধ্য দিয়ে আরও একটি গভীর বিষয় বারবার ফিরে আসে, বিশ্বাসকে এমন কিছু হিসেবে দেখা, যা জীবনের অংশ; আলাদা কোনও ঘরে বন্দি করে রাখার বিষয় নয়।
 
“আমার সব বইয়ের মূল কথা হল, নিজের স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে ধর্মকে ত্যাগ করতে হবে না,” তিনি বলেন। সারাহর কাছে এই ভাবনা শুধুমাত্র তাঁর লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্পর্ক, উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা কঠিন সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিশ্বাস কীভাবে দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, পাঠকেরা যেন সেই বিষয়টিও ভাবেন, এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
 
“পাঠকেরা যখন বইটি বন্ধ করবেন, তখন আমি চাই তাঁরা যেন ভাবেন, কীভাবে তাঁরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবন ও সিদ্ধান্তের মধ্যে নিজেদের বিশ্বাসকে ধারণ করতে পারেন।” এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকেই তৈরি হয়নি; তাঁর শিক্ষাজীবনও এর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সারাহ ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন বিষয়ে শিক্ষাগত পটভূমি নিয়ে বর্তমানে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর পেশাগত যাত্রায় গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একাডেমিক প্রশিক্ষণ তাঁকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে, প্রশ্ন তুলতে, বিশ্লেষণ করতে এবং দৃশ্যমান বিষয়ের বাইরে গিয়ে ভাবতে সাহায্য করেছে।
 
তাঁর কথায়, “আমার সামগ্রিক শিক্ষাই আমার লেখার মধ্য দিয়ে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করি, তা গড়ে তুলেছে। এর ফলে আমি পরিস্থিতিকে আরও সমালোচনামূলকভাবে দেখতে পারি এবং এমন একটি বোঝাপড়া নিয়ে ভাবতে পারি, যা হয়তো অন্যথায় আমার মধ্যে তৈরি হতো না।”
"The White pigeon" বই এর প্রচ্ছদ
 
শিক্ষাদান, গবেষণা এবং লেখালেখি, এই তিনটি একসঙ্গে সামলাতে গেলে ব্যস্ততার কোনও অভাব থাকার কথা নয়। কিন্তু সারাহ তাঁর সৃজনশীল কাজকে সবসময় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা আরেকটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন না। বরং অনেক সময় এটিই তাঁকে অন্য সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
 
“যেদিন মনে হয় কাজ ছাড়া অন্য কোনও কিছুর জন্য আমার হাতে একেবারেই সময় নেই,” তিনি বলেন, “সেই দিনগুলিতেই আবার নিজেকে সামলানোর জন্য নিজের ভাবনাগুলো লিখে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।” এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সৎ। পেশাগত জীবনের ফাঁকে লেখালেখির জন্য সবসময় নির্দিষ্ট সময় বের করা সম্ভব হয় না। কখনও কখনও লেখার তাগিদ নিজেই নিজের জায়গা করে নেয়।
 
সম্ভবত এর কারণ, সারাহর কাছে লেখালেখি শুধুমাত্র অর্জনের তালিকায় আরও একটি সাফল্য যোগ করার বিষয় নয়। বরং এটি তাঁর জন্য নিজের ভাবনা প্রকাশের একটি মাধ্যম, চিন্তাভাবনা করার একটি পরিসর, বিভিন্ন ধারণাকে অনুসন্ধান করার সুযোগ এবং এমন কিছু সৃষ্টি করার পথ, যা অন্য কারও মনেও সাড়া ফেলতে পারে।
 
তিনি বিষয়টিকে আরও সহজভাবে বলেন, “চিত্রশিল্পীরা ছবি আঁকেন, বেকাররা বেক করেন এবং লেখকেরা লেখেন।” ব্যস্ত জীবনও যে সৃজনশীলতার এই স্বাভাবিক তাগিদকে থামিয়ে দিতে পারে না, এই কথাটিই যেন তার যথার্থ প্রকাশ।
 
অনলাইন প্ল্যাটফর্মের একজন পাঠক থেকে স্বপ্রকাশিত লেখক এবং একইসঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ হয়ে ওঠার সারাহর যাত্রাটি কোনও প্রচলিত পথে এগোয়নি। ফিকশন, গবেষণা ও শিক্ষাজগতকে একসঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার কোনও বড় পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। বরং শুরু হয়েছিল একটি ঘাটতি চোখে পড়া থেকে, এবং সেই ঘাটতি নিজেই পূরণ করার চেষ্টা করলে কী হতে পারে, সেই ভাবনা থেকে।
 
 
আজ তাঁর কাজ ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন, বিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কল্পকাহিনি ও বাস্তবতা, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মধ্যবর্তী এক জায়গায় অবস্থান করছে। সম্ভবত এটাই তাঁর গল্পগুলিকে মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো করে তুলেছে।
 
তাঁর গল্পগুলি তরুণ মুসলিম নারীদের নিজেদের কোনও একটি পরিচয়কে বেছে নিয়ে অন্য পরিচয়টি ছেড়ে দিতে বলে না। বরং সেখানে জায়গা রয়েছে জটিলতার, নিষ্ঠার পাশাপাশি স্বপ্ন, মূল্যবোধের পাশাপাশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ‘হ্যাপিলি এভার আফটার’-এর পরের বাস্তবতার পাশাপাশি ভালোবাসার।
 
সারাহ লেখালেখি শুরু করেছিলেন কারণ তিনি এমন যথেষ্ট গল্প খুঁজে পাননি, যেগুলির মধ্যে নিজের ছায়া দেখতে পান। এখন তিনি এমন গল্প লিখছেন, যেখানে অন্যরাও হয়তো অবশেষে নিজেদের চিনে নিতে পারবেন।


শেহতীয়া খবৰ