মেঘালয়: বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল এলাকা মৌসিনরাম ও চেরাপুঞ্জিতে খরার ঝুঁকি, গবেষণায় উদ্বেগ

Story by  PTI | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 7 h ago
মেঘালয়: বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল এলাকা মৌসিনরাম ও চেরাপুঞ্জিতে খরার ঝুঁকি, গবেষণায় উদ্বেগ
মেঘালয়: বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল এলাকা মৌসিনরাম ও চেরাপুঞ্জিতে খরার ঝুঁকি, গবেষণায় উদ্বেগ

শিলং:

বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিবহুল স্থান মেঘালয়ের মৌসিনরাম ও চেরাপুঞ্জিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বাড়লেও বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কমছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে।

সম্প্রতি Theoretical and Applied Climatology পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৯৮১ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত মেঘালয় ও সংলগ্ন এলাকার সম্ভাব্য জলবায়ু ও জলবিদ্যাগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অতিবৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় কীভাবে একইসঙ্গে খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষক আশেষ রুদ্র পাল ও পঙ্কজ কুমার রায়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বৃষ্টিপাত ক্রমশ অল্প কয়েকটি সময়ে প্রবলভাবে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে হালকা বৃষ্টি এবং বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কমছে। Simple Daily Intensity Index (SDII)-এ সর্বোচ্চ স্থানীয় বৃদ্ধি হয়েছে প্রতি বছর ০.০৮ মিলিমিটার/দিন পর্যন্ত। একই সময়ে বছরে গড়ে ০.৪ দিন করে বৃষ্টির দিনের সংখ্যা কমেছে।

SDII হল এমন একটি জলবায়ু সূচক, যা নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টির দিনে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ (মিলিমিটার/দিন) পরিমাপ করে।

গবেষকদের মতে, সাধারণ ধারণা হল বৃষ্টিপাত বাড়লে খরার ঝুঁকি কমবে। কিন্তু মেঘালয়ের ক্ষেত্রে গবেষণায় উল্টো প্রবণতা দেখা গিয়েছে—খরার ঝুঁকি বাড়ছে। রাজ্যের খাড়া ভূপ্রকৃতি এবং অগভীর মাটির কারণে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবল বৃষ্টির জল দ্রুত মাটির উপর দিয়ে বয়ে যায়, মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণও কমে। ফলে বর্ষায় বিপুল বৃষ্টিপাত হলেও শুষ্ক মরশুমে পর্যাপ্ত জল নাও থাকতে পারে।

এর সঙ্গে বাড়তি চাপ তৈরি করছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রতি বছর সর্বোচ্চ ০.০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে মাটি, উদ্ভিদ ও অন্যান্য পৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভবনজনিত জলক্ষয় বাড়ে এবং বৃষ্টিহীন সময়ে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়।

খরার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে গবেষকেরা তিন মাসের সময়সীমায় Standardized Precipitation Evapotranspiration Index বা SPEI ব্যবহার করেন। উচ্চ নিঃসরণভিত্তিক SSP585 পরিস্থিতিতে মাঝারি, তীব্র ও চরম খরার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতের সময়সীমা যত এগোবে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই খরার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

নদীর জলপ্রবাহের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। মেঘালয় থেকে উৎপন্ন বা উল্লেখযোগ্য জলপ্রবাহ গ্রহণকারী সারি-গোয়াইন এবং সুরমা-মেঘনা অববাহিকা নিয়ে জলবিদ্যাগত মডেলিং করা হয়েছে। SSP585 পরিস্থিতিতে দূর ভবিষ্যতে সারি-গোয়াইন অববাহিকায় গড় বার্ষিক জলপ্রবাহ সর্বোচ্চ ৯.৮ শতাংশ এবং সুরমা-মেঘনা অববাহিকায় ১১.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে মডেল পূর্বাভাস দিয়েছে।

গবেষকদের মতে, নদীর জলপ্রবাহ বর্ষাকালেই বেশি কেন্দ্রীভূত থাকবে—জুন ও জুলাইয়ে প্রবাহ সর্বোচ্চ হওয়ার পর বছরের পরবর্তী সময়ে তা কমতে পারে। ফলে বছরের শেষ দিকে জলসংকট বা জলবিদ্যাগত খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে গবেষণায় বন উজাড়, শহর সম্প্রসারণ, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের মতো মানবসৃষ্ট কারণগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাই শুধু মোট বৃষ্টিপাত নয়, বৃষ্টির তীব্রতা ও বণ্টন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অববাহিকাভিত্তিক জলপ্রবাহকেও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাতেও জলসংকটের ছবি ফুটে উঠছে। সোহরা ও মৌসিনরামের বাসিন্দাদের দাবি, চলতি বছর বেশ কয়েকটি জলাশয় ও জলপ্রপাত দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।

মাওকিসিয়েমের বাসিন্দা এবং একটি গেস্টহাউসের মালিক পি হুজোন বলেন, “সোহরা এলাকার অনেক জলপ্রপাত শুকিয়ে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই আমি এই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।”