মাঘ বিহুর খাদ্যের অন্তরালে লুকানো বিজ্ঞান

Story by  Munni Begum | Posted by  Aparna Das • 20 d ago
মাঘ বিহুর খাদ্য
মাঘ বিহুর খাদ্য
 
মুন্নী বেগম / গুয়াহাটি

মাঘ বিহু অসমীয়াদের কাছে কেবল একটি উৎসবই নয়; এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতি, প্রাকৃতিক জ্ঞান ও জীবনধারার এক শক্তিশালী প্রতিফলন। মাঘ বিহুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা পিঠা-পানা, লাড়ু, দই, কোমল চাল, তিল, গুড়, মাছ-মাংস; এসব খাবারকে আমরা প্রায়ই শুধু ঐতিহ্য বা স্বাদের দৃষ্টিতে দেখি। কিন্তু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এই খাদ্যগুলো উৎসবের আনন্দের জন্যই শুধু নয়; বরং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং শীতকালে মানবদেহের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠা এক বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যব্যবস্থা। আজকের আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণা যেসব সত্য ব্যাখ্যা করছে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে বহু আগেই সেগুলো উপলব্ধি করেছিলেন।
 
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শীতকাল সাধারণত স্যাঁতসেঁতে ও ঠান্ডা। পাহাড় ও সমভূমির সংমিশ্রণে এই অঞ্চলে খাদ্যের চাহিদাও ভিন্নরকম। শীতে শরীরকে উষ্ণ রাখতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। এ সময় বিপাকক্রিয়া কিছুটা ধীর হলেও শক্তির চাহিদা বেড়ে যায়। তাই শীতকালীন খাদ্য হওয়া দরকার শক্তিদায়ক, সহজপাচ্য এবং দেহকে ভেতর থেকে উষ্ণতা জোগানো। মাঘ বিহুর খাবার এই সব দিকেই উপযুক্ত। চাল থেকে তৈরি পিঠা-পানা ও সান্দহ-গুড়ি শরীরে কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে, যা তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস।
 
মাঘ বিহুর জলপান
 
মাঘ বিহুর খাদ্যে ফারমেন্টেশনের ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অসমের দই ও কোমল চাল যেমন, মেঘালয়ের তুংগ্রিম্বাই, মণিপুরের সোইবুম, নাগাল্যান্ডের আখুনি, মিজোরামের বেকাং; এই সব ফারমেন্টেড খাবারেরই এক ধারার অন্তর্গত। ফারমেন্টেশনের ফলে খাবারে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যাকে আধুনিক ভাষায় ‘প্রোবায়োটিকস’ বলা হয়। এই প্রোবায়োটিকস হজমশক্তি বাড়ায়, অন্ত্র সুস্থ রাখে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে। শীতে যখন সর্দি-কাশি ও সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে, তখন এ ধরনের খাবার অত্যন্ত উপকারী; যা প্রমাণ করে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সমাজ বহু আগেই হজম ও রোগপ্রতিরোধের গুরুত্ব বুঝে ফেলেছিল।
 
মাঘ বিহুর খাদ্যে তিলের বিশেষ স্থান রয়েছে। তিলে প্রচুর স্বাস্থ্যকর চর্বি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। শীতে চর্বি শরীরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। অসম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের বহু জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় তিলের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। তিলের লাড়ু বা তিলপিঠা শুধু স্বাদই দেয় না; গাঁটের ব্যথা কমাতে, হাড় মজবুত করতে এবং ত্বকের শুষ্কতা দূর করতেও সহায়ক। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও এই গুণগুলোর কথা স্বীকার করে। তাই শীতে তিলজাত খাবারের চল গড়ে উঠেছে।
 
তিলের লাড়ু
 
গুড় মাঘ বিহুর খাদ্যতালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু মিষ্টির উপকরণ নয়; প্রাকৃতিক শক্তির এক উৎকৃষ্ট উৎস। গুড়ে আয়রন ও নানা খনিজ পদার্থ থাকে, যা রক্তসঞ্চালন উন্নত করে ও দেহকে সতেজ রাখে। ঠান্ডা দিনে গুড় শরীরকে ভেতর থেকে উষ্ণতা দেয়; এই লোকবিশ্বাসেরও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে।
 
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে মাছ ও মাংসের গুরুত্ব প্রাচীনকাল থেকেই। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মাছ, পাহাড়ি অঞ্চলের শুকনো মাছ বা মাংস, সবই প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎকৃষ্ট উৎস। মাঘ বিহুতে মাছ-মাংসের ব্যবহার এই অঞ্চলের খাদ্যভিত্তিক অভিযোজনের অংশ। শীতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়; এগুলি পেশি গঠন করে, ক্ষত সেরে ওঠায় সাহায্য করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। মাছের ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে ও প্রদাহ কমায়। শীতে এই খাবার দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায় এবং দেহকে সক্রিয় রাখে।
 
মাঘ বিহুর খাদ্য 
 
মাঘ বিহুর অধিকাংশ খাবার গরম বা সদ্য রান্না করা হয়। বিজ্ঞান বলছে, শীতে গরম খাবার সহজে হজম হয়। গরম খাবার পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে ও রক্তসঞ্চালন বাড়ায়। জ্বালায় বানানো পিঠা, গরম ভাতের সঙ্গে দই, সদ্য রান্না করা মাছ-মাংস; এই অভ্যাসগুলো শীতের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও উপযোগী।
 
সব মিলিয়ে, মাঘ বিহুর খাদ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঋতুভিত্তিক আহারের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যে খাবার ঋতু অনুযায়ী প্রকৃতিতে সহজলভ্য, সেটাই স্বাস্থ্যের পক্ষে সর্বোত্তম; এ কথা আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও বলে। বিজ্ঞান শব্দটি না জেনেও আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন।
 
বিহুর পিঠা-পানা তৈরিতে ব্যস্ত গ্রামের নারীরা
 
মাঘ বিহুর খাদ্য কেবল উৎসবের আনন্দ, রুচি বা ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মানুষের প্রকৃতিবোধ, জীবনদর্শন এবং বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার এক শক্তিশালী নিদর্শন। যে সমাজ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে থেকে ঋতু, জলবায়ু ও মানবদেহের চাহিদা বুঝে খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তাদের জ্ঞান নিছক লোকাচার নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ বিজ্ঞান। আজকের দিনে যখন প্রক্রিয়াজাত, কৃত্রিম ও অস্বাস্থ্যকর খাবার ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস দখল করে নিচ্ছে, তখন মাঘ বিহুর ঐতিহ্যবাহী খাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়; প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের পথ। এই খাদ্যসংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু অতীতের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, পরিচয় এবং টেকসই জীবনধারাকেও সুরক্ষিত করা।