অপর্ণা দাস/ গুয়াহাটি
পৌষ সংক্রান্তি বাঙালির ক্যালেন্ডারের একটি তারিখমাত্র নয়, এটি ঋতু, ফসল ও পারিবারিক বন্ধনের এক আবেগঘন মিলনমুহূর্ত। শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে ওঠা রোদ, খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধ, আর চাল-নারকেলের পিঠে; এই সব মিলিয়েই তৈরি হয় পৌষ সংক্রান্তির চেনা ছবি। বাংলার গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র এই উৎসব দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। শুধু বাংলা নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্যেও নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ ঘিরে এই সময়ে উৎসব পালিত হয়; অসমে ভোগালী বিহু, ওড়িশায় মকর সংক্রান্তি, তামিলনাড়ুতে পোঙ্গাল। তবু পিঠে-পুলিকে কেন্দ্র করে বাংলার পৌষ সংক্রান্তির স্বাদ ও আবেগ আলাদা।
এক সময় পৌষ সংক্রান্তি মানেই ছিল বাড়ির ভেতরের উৎসব। যেখানে হাঁড়ির আঁচে ফুটত শুধু পিঠে নয়, ফুটে উঠত সম্পর্ক, ভালোবাসা আর পারিবারিক বন্ধন। ভোর থেকে শুরু হত প্রস্তুতি; চাল ভেজানো, নারকেল কোরা, গুড় জ্বাল। রান্নাঘরে একসঙ্গে বসে কাজ করতেন পরিবারের নারী সদস্যরা; মা, ঠাকুমা, পিসি, কাকিমারা। পিঠে-পুলির উৎসব আসলে ছিল নারীর অদৃশ্য শ্রম ও নিঃশব্দ ভালোবাসার উৎসব। সেই শ্রমের কোনও আর্থিক মূল্য ছিল না, কোনও স্বীকৃতিও নয়, অথচ সেই হাতের তৈরি পিঠের স্বাদেই জমে থাকত আমাদের শৈশব, সম্পর্ক আর স্মৃতি।
প্রতীকী ছবি
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে পৌষ সংক্রান্তির ঘরোয়া রূপ ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কর্মব্যস্ত জীবন, সময়ের অভাব, ছোট পরিবার, ফ্ল্যাট সংস্কৃতি; সব মিলিয়ে আজ বহু বাড়িতেই আর পিঠে তৈরি হয় না। সংক্রান্তির দিনে রান্নাঘরের বদলে ভিড় জমে বাজারে, মেলায়, শপিং মলে বা অনলাইন অ্যাপে। পাটিসাপটা, দুধপুলি, চিতই পিঠে, সবই পাওয়া যাচ্ছে প্রস্তুত অবস্থায়।
এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই কষ্টের। কারণ পিঠে শুধু খাবার নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া, একটি মিলনক্ষেত্র। বাড়িতে পিঠে না হওয়া মানে সেই একসঙ্গে বসে কাজ করা, গল্প করা, হাসি-ঠাট্টার মুহূর্তগুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছি?
পৌষ পার্বণ উপলক্ষে গ্রামের মহিলারা পিঠে পুলি তৈরির প্রস্তুতি নেওয়ার এক দৃশ্য (ফাইল)
তবে এই ছবির আরেকটি দিকও আছে। আজ যে পিঠে বাজার থেকে কেনা হচ্ছে, তা তৈরি করছেন কেউ না কেউ। বহু ক্ষেত্রে এই পিঠে তৈরি করছেন গ্রামীণ মহিলারা, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা, ছোট ব্যবসায়ীরা। এক সময় যে নারী শ্রম ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে অদৃশ্য ছিল, আজ তা অনেক ক্ষেত্রে জীবিকার উৎস হয়ে উঠছে। পিঠে-পুলি এখন শুধু উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, বহু পরিবারের আয়ের মাধ্যম।
এখানেই তৈরি হচ্ছে এক দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে আমরা হারাচ্ছি ঘরোয়া সংস্কৃতির উষ্ণতা, অন্যদিকে সেই সংস্কৃতির বাণিজ্যিক রূপ বহু মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিচ্ছে। পিঠে আজ আর শুধু ভালোবাসার প্রতীক নয়, তা শ্রমের মূল্যও বহন করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটা কি শুধু সংস্কৃতির অবক্ষয়, নাকি সংস্কৃতির রূপান্তর? বাড়িতে পিঠে না বানানোর আক্ষেপ যেমন সত্যি, তেমনই সত্যি যে বাজারের পিঠে বহু পরিবারের আয়ের পথ খুলে দিচ্ছে। নারী শ্রম, যা এক সময় অদৃশ্য ছিল, আজ তা অর্থমূল্যে পরিণত হচ্ছে, যদিও তার সামাজিক স্বীকৃতি এখনও সম্পূর্ণ নয়।
শহরের রাস্তার পাশে মহিলারা পিঠে বিক্রি করার এক দৃশ্য (ফাইল)
শহরের পৌষ সংক্রান্তি তাই আজ এক বদলে যাওয়া উৎসব। হাঁড়ির আঁচ কমেছে, কিন্তু দোকানের আলো বেড়েছে। উঠোনের বদলে মেলা, রান্নাঘরের বদলে ফুড স্টল। তবু উৎসবের মূল অনুভূতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। পিঠের স্বাদে আজও ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি, মায়ের হাতের রান্নার কথা, গ্রামের বাড়ির সংক্রান্তির সকাল।
এবার এই বলে ইতি টানতে পারি যে, সংস্কৃতি আসলে কখনও স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলায়। পৌষ সংক্রান্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রশ্ন শুধু এটুকুই, এই পরিবর্তনের ভিড়ে আমরা কি পিঠে-পুলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই মানবিক স্পর্শ, সম্পর্ক আর আবেগকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব? বাজারের পিঠের পাশাপাশি যদি সেই গল্পটুকুও বাঁচে, তবেই সংক্রান্তি তার পূর্ণতা পাবে।