বুলবুলিতলা থেকে শান্তিপুর: হাজার মানুষের জীবিকা গড়ে তোলা জাহাঙ্গীর মল্লিকের সাফল্যের গল্প

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 22 h ago
 জাহাঙ্গীর মল্লিক
জাহাঙ্গীর মল্লিক
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

পূর্ব বর্ধমানের এক সাধারণ গ্রামের ছেলে। শুরুটা ছিল স্থানীয় বাজারে একটি ছোট্ট শাড়ির স্টল দিয়ে। সেই তরুণ উদ্যোক্তাই আজ হাজার হাজার তাঁতশিল্পী, শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার অন্যতম ভরসা। তিনি জাহাঙ্গীর মল্লিক। পূর্ব বর্ধমান জেলার বুলবুলিতলার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠিত জে. এম বাজার আজ নদিয়ার শান্তিপুরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও সিল্ক শাড়ির অন্যতম বৃহৎ বিপণনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। 
 
২০০৬ সালে জাহাঙ্গীর মল্লিকের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়। তখন তাঁর হাতে ছিল না বড় পুঁজি কিংবা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক পরিকাঠামো। স্থানীয় বাজারে একটি ছোট্ট শাড়ির দোকান থেকেই তিনি ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম, বাজার সম্পর্কে গভীর ধারণা এবং গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা তাঁকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়। 
 

বর্ধমান জেলার বুলবুলিতলা গ্রামে বেড়ে ওঠা জাহাঙ্গীর স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করার পর বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে বস্ত্রশিল্প সম্পর্কে সরকারি প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। সেই প্রশিক্ষণই তাঁকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শাড়ি ব্যবসার সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, শান্তিপুরের শতাব্দীপ্রাচীন তাঁতশিল্প শুধু বাংলার গর্ব নয়, সঠিক বিপণন ও উদ্যোগ পেলে এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। 
 
সেই ভাবনা থেকেই শান্তিপুরকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন জাহাঙ্গীর। নদিয়ার শান্তিপুর বহু শতাব্দী ধরে তাঁতশিল্প ও শান্তিপুরি শাড়ির জন্য বিখ্যাত। এখানকার তাঁতশিল্প ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হ্যান্ডলুম শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। 
 
বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জে. এম বাজার। অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি শাড়ির দোকান নয়, বরং একটি বৃহৎ ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে জে. এম বাজার শান্তিপুরের অন্যতম পরিচিত শাড়ি বিপণনকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ক্রেতার সমাগম হয়।
 
তবে জাহাঙ্গীর মল্লিকের সাফল্যের আসল গল্প শুধু ব্যবসার প্রসার নয়। তাঁর উদ্যোগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল। তাঁতশিল্পী, রংকর্মী, সুতো ব্যবসায়ী, পরিবহণ কর্মী, দোকানের কর্মচারী থেকে শুরু করে ই-রিকশা চালক, অসংখ্য মানুষ আজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, তাঁর ব্যবসার প্রভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। 
 
দোকানের ভেতরের দৃশ্য
 
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, শান্তিপুর রেলস্টেশন থেকে বাজার পর্যন্ত ক্রেতাদের যাতায়াতের জন্য ই-রিকশা পরিষেবাকে তিনি উৎসাহিত করেছেন। এর ফলে প্রতিদিন বহু ই-রিকশা চালকের নিয়মিত আয় নিশ্চিত হয়। একটি ব্যবসা কীভাবে স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জে. এম বাজার তারই এক বাস্তব উদাহরণ। 
 
জাহাঙ্গীর মল্লিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে নতুন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। একসময় যে তাঁতশিল্প নানা সংকটে পড়েছিল, সেই শিল্পের পুনর্জাগরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ, উৎপাদন বজায় রাখা এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বহু পরিবারকে নতুন করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দিয়েছেন। 
 
মাত্র চল্লিশ বছর বয়সের মধ্যেই জাহাঙ্গীর মল্লিক প্রমাণ করেছেন যে সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন উদ্যোক্তার প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার উন্নতির সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে যায়। বুলবুলিতলার সেই সাধারণ যুবকের হাত ধরে আজ শান্তিপুরের তাঁতশিল্প নতুন আশার আলো দেখছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশাড়িকে দেশ-বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছেন, তা বাস্তবায়নের পথে জে. এম বাজার ইতিমধ্যেই এক উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে।