“সুভাষ কি সত্যিই ফিরেছিলেন? বইমেলার এক বই ঘিরে বাঙালির নতুন প্রশ্ন, পুরনো রহস্যের পুনরুত্থান”

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
“সুভাষ কি সত্যিই ফিরেছিলেন?  বইমেলার এক বই ঘিরে বাঙালির নতুন প্রশ্ন, পুরনো রহস্যের পুনরুত্থান”
“সুভাষ কি সত্যিই ফিরেছিলেন? বইমেলার এক বই ঘিরে বাঙালির নতুন প্রশ্ন, পুরনো রহস্যের পুনরুত্থান”
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

শীত এলেই আমাদের শৈশব ও কৈশোরে গ্রামবাংলার ময়দানে ম্যারাপ বেঁধে বসত যাত্রার আসর। চিৎপুরের নামিদামি যাত্রাদল নিয়ে আসত সামাজিক ও ঐতিহাসিক যাত্রাপালা। আলো, ঢাক, সংলাপ আর আবেগে ভর করে সেই যাত্রাপালাগুলির মধ্যে একটি আজও স্মৃতিতে দগদগে, “সুভাষ ঘরে ফেরে নাই”। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান, মৃত্যু না কি প্রত্যাবর্তন, এই প্রশ্ন তখনও দর্শকের মনে দোলা দিত, আজও দেয়।
 
সেই যাত্রাপালার রেশ ধরেই বহু বছর আগে রিপ্লেক্স পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত একটি বই পড়েছিলেন অনেকে। রোমাঞ্চকর সেই পাঠ শুধু সাহিত্য নয়, ইতিহাস নিয়ে সন্দেহ, অনুসন্ধান ও প্রশ্ন তোলার সাহস জুগিয়েছিল। কারণ ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী বীর এবং কার্যত ভারতের অঘোষিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু নিয়ে আজও ধোঁয়াশা কাটেনি।
 

সরকারিভাবে বলা হয়, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকু (বর্তমান তাইপে)-তে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় নেতাজীর। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাকে ঘিরে জন্ম নেয় অসংখ্য প্রশ্ন ও জনশ্রুতি। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তি, নেতাজী কি আদৌ মারা গিয়েছিলেন, না কি তিনি অন্য কোথাও আত্মগোপনে ছিলেন?
 
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বসে একাধিক কমিশন। শাহনওয়াজ কমিশন, খোসলা কমিশনের পর সবচেয়ে আলোচিত হয় মুখার্জি কমিশন। বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জির নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন স্পষ্টভাবে জানায়, তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু প্রমাণিত নয়। আরও বিস্ময়কর হলো, কমিশনের বহু নথি ও তদন্তের পূর্ণ বিবরণ আজও সম্পূর্ণভাবে জনসমক্ষে আসেনি। এই অপ্রকাশিত সত্যই যেন রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।
 
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় হঠাৎ করেই নজর কেড়েছে একটি বই। বইটির নাম, “সুভাষ ফিরেছিলেন”। লেখক একজন তরুণ সাংবাদিক ও ইউটিউবার, যিনি বহু বছর ধরে তথ্য, সাক্ষাৎকার, নথি ও লোককথা জড়ো করে এই বইটি লিখেছেন। বইমেলায় প্রকাশের পর থেকেই বইটি বিক্রি হয়েছে হট কেকের মতো। প্রকাশনা স্টলের সামনে লাইন, পাঠকের চোখে উত্তেজনা, সব মিলিয়ে বইমেলায় যেন এক অদ্ভুত আবেগের বিস্ফোরণ।
 
বইটির দাবি সরাসরি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানে না, কিন্তু একের পর এক তথ্য ও যুক্তি সাজিয়ে প্রশ্ন তোলে, নেতাজী কি সত্যিই দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন চিরতরে, না কি তিনি ফিরেছিলেন, অন্য পরিচয়ে, অন্য সময়ে? লেখক দাবি করেছেন, তিনি অনুমান নয়, বরং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পাঠককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
 

এই বইয়ের সাফল্য আসলে শুধু একটি প্রকাশনার সাফল্য নয়। এটি বাঙালির মানসিকতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসকে যেমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে সত্য জানার এক প্রবল আগ্রহ আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। বইমেলায় তরুণ প্রজন্মের হাতে বইটি দেখা যাচ্ছে, প্রবীণ পাঠকরাও স্মৃতিচারণ করছেন যাত্রাপালা, পুরনো বই, গোপন গল্পের কথা।
 
ইতিহাসবিদদের একাংশ বলছেন, আবেগে ভেসে যাওয়া ঠিক নয়; প্রামাণ্য নথিই শেষ কথা। আবার অন্য অংশের মত, রাষ্ট্র নিজেই যখন সমস্ত নথি প্রকাশ করছে না, তখন প্রশ্ন তোলাই নাগরিকের অধিকার। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই “সুভাষ ফিরেছিলেন” নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে নেতাজীকে।
 
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু শুধু একজন মানুষ নন, তিনি একটি চেতনা। সেই চেতনার মৃত্যু হয় না। তাই হয়তো বারবার তিনি ফিরে আসেন, কখনও যাত্রাপালায়, কখনও বইয়ের পাতায়, কখনও বইমেলার ভিড়ে। প্রশ্ন একটাই থেকে যায়, সুভাষ কি সত্যিই ফিরেছিলেন, না কি তিনি আমাদের প্রশ্নের মধ্যেই চিরকাল বেঁচে আছেন?