“এভারেস্ট জয়ের পরও লড়াই থামেনি”— প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগে মুখ খুললেন পর্বতারোহী পিয়ালী বসাক
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ, চন্দননগর
মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের পরও তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই নাকি চলেছে পাহাড়ের বাইরে। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত পর্বতারোহী ও চন্দননগরের স্কুলশিক্ষিকা পিয়ালী বসাক এবার প্রকাশ্যে আনলেন একাধিক গুরুতর অভিযোগ। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পিয়ালী দাবি করেছেন, এভারেস্ট অভিযানের জন্য সংগ্রহ করা অর্থের একটি বড় অংশ তিনি পাননি। শুধু তাই নয়, তাঁকে নানা ভাবে মানসিক চাপে রাখা, নিরুৎসাহিত করা এবং সাফল্যের কৃতিত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।সাক্ষাৎকারে পিয়ালী বসাক বলেন, “এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতির সময় আমি ভেবেছিলাম সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা আমার পথ সহজ করবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। নানা সময়ে আমাকে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা একজন ক্রীড়াবিদ বা পর্বতারোহীর ক্ষেত্রে হওয়া উচিত নয়।”
তাঁর দাবি, অভিযানের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের পুরো হিসাব কখনও তাঁর সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।পিয়ালীর কথায়, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাকে নানা ভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু আমি জানতাম, এতদিনের পরিশ্রমকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। তাই সব বাধা উপেক্ষা করেই লক্ষ্যপূরণের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম।”
এভারেস্ট অভিযানের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচিতে অর্থ, সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে পিয়ালীর অভিযোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ঋণ এবং শুভানুধ্যায়ীদের সাহায্যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন।সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, এভারেস্ট জয়ের পর তিনি আশা করেছিলেন রাজ্যের তরফে যথাযথ স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে উপেক্ষিত হতে হয়েছে বলেই তাঁর দাবি।
এই অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে তৎকালীন ক্রীড়া প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ ও পর্বতারোহী যদি এমন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন, তবে তা নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিষয় নয় বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আর্থিক অনিয়মের গণ্ডি ছাড়িয়ে ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত বড় প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
রাজনৈতিক মহলেও ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের একাংশ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন ক্রীড়াবিদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত এবং সমস্ত আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।অন্যদিকে, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযোগগুলির বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সব পক্ষের বক্তব্য সামনে আসা জরুরি।
পিয়ালী বসাকের জীবনের গল্প বরাবরই সংগ্রামের। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছেন। সেই মানুষটির মুখে প্রশাসনিক বাধা ও বঞ্চনার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।তবে তদন্তের আগে অভিযোগগুলিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, পিয়ালী বসাকের মতো একজন প্রতিষ্ঠিত পর্বতারোহী প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ আনায় বিষয়টির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
এখন নজর তদন্ত, তথ্যপ্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির প্রতিক্রিয়ার দিকে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এভারেস্ট জয়ের পর পিয়ালী বসাক যে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছেন, তা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে।