গান স্যালুটে শেষ বিদায় অগ্নিবীর সাফি শেখকে, কাঁদছে গোটা গ্রাম! ছুটি কাটিয়ে আর ফেরা হল না ডিউটিতে, চোখের জলে ভাসল গোটা গ্রাম
তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
অগ্নিবীর সাফি শেখ একদিন দেশের সেবা করার শপথ নিয়েছিলেন, অথচ সেই যুবকেই গান স্যালুটের মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানাতে হল সেনাকে। ছুটিতে বাড়ি ফিরে অগ্নিবীর জওয়ান সাফি শেখের আর কর্মস্থলে ফেরা হল না। রাস্তাতেই ঘটে গেল মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা। চেষ্টা করেও শেষরক্ষা হল না। জওয়ানের অকালমৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকা জুড়ে। এই জওয়ানকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গান স্যালুটের মাধ্যমে।
সাফি শেখ নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের পলাশী-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ভুরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই অগ্নিবীর হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন সাফি শেখ। পড়াশুনার পাশাপাশি ফুটবলার হিসাবে গোটা এলাকায় সুনাম ছিল তাঁর। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর এটাই ছিল তাঁর দ্বিতীয়বার ছুটিতে বাড়ি ফেরা। কিন্তু সেই ছুটিই যে জীবনের শেষ ছুটি হয়ে উঠবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি পরিবার থেকে তাঁর বন্ধুমহল। এই দুঃসংবাদ চাউর হতেই শেষবারের মত এই জওয়ানকে দেখতে ভিড় বাড়তে থাকে।
প্রত্যেকের মুখে একটাই আক্ষেপ, বড্ড অকালে চলে গেল ছেলেটা। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় ধুবুলিয়ার ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে সাফি যাচ্ছিলেন বাইক নিয়ে। সেই সময় অপর একটা গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর জখম হয়ে পড়ে যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় ধুবুলিয়া হাসপাতালে। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চিরদিনের মত সকলকে ছেড়ে চলে যান। খবরটা হাওয়ার বেগে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তেই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। কয়েক মাস আগেই কত স্বপ্ন নিয়ে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এই ছেলে, তাঁর এমন করে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
গান স্যালুটে শেষ বিদায় অগ্নিবীর সাফি শেখকে
স্থানীয় সূত্রে খবর, সাফির জীবনে ছিল নানা উত্থান-পতন। প্রায় বছর পাঁচেক আগে তাঁর বাবার মৃত্যু হয় বাড়ির সামনেই পথ দুর্ঘটনায়। বাবা অকালে চলে যাওয়ায় মাকে নিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলেছিলেন সাফি। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল তাঁর। ফুটবল খেলায় দক্ষতার জন্য এলাকায় পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল। খেলাধুলার পরিধি বাড়লেও সাফির স্বপ্ন ছিল আরও বড়। কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মিত অনুশীলনের জোরে এই বছরেই জানুয়ারি মাসে অগ্নিবীর হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয় সাফি-র। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট দূর করার পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। মিশুকে স্বভাবের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সহকর্মীদের মধ্যেও নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনা বদলে দিল সব পরিস্থিতি। যে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন সাফি, সেই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেই তাঁকে জানানো হল শেষ সম্মান। গান স্যালুটের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। ছেলের এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে মাকে হারাতে হল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অবলম্বনকে। যাঁকে ঘিরে স্থানীয়দের অনেক স্বপ্ন ছিল সাফিকে নিয়ে, তাই তাঁর এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেনা ভুরুলিয়া গ্রাম। জীবনের পথচলা থেমে গেল মাত্র কয়েক মাসের সেনাজীবনের পরই। কিন্তু এই অগ্নিবীরের কথা সারাজীবন থেকে যাবে এলাকার মানুষের স্মৃতিতে।