প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও ভি মোহনার বেঞ্চ DNPA-র দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় আইন ও বিচার মন্ত্রক এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রককে (MeitY) নোটিস জারি করেছে। মামলাটি আগামী ১৭ নভেম্বর অন্যান্য বিচারাধীন মামলার সঙ্গে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
DNPA-র হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী মাধবী দিবান সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আইনের অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়ার আবেদন বিবেচনার আর্জি জানান। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিকতার জন্য কোনও নির্দিষ্ট ছাড় না থাকলে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রচলিত পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।
দিবান আদালতে বলেন, কোনও ব্যক্তিকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে তাঁর অনুমতি নিতে হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাঁর কথায়, কোনও সংবাদ ভুল, অসত্য বা তথ্যগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হলে সংবাদমাধ্যমকে তার পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা কার্যত সংবাদপত্রের উপর আগাম সেন্সরশিপ চাপিয়ে দেওয়ার শামিল।
তিনি আরও জানান, আগের আইনগুলিতে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ছাড়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমান আইনে সেই ছাড় কেন রাখা হয়নি, তা স্পষ্ট নয়। সাংবাদিকতার কাজের সঙ্গে এই আইনের একাধিক বিধান অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও দাবি করেন তিনি।
ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনে তথ্য জানার অধিকার আইন, ২০০৫-এর ৮(১)(জে) ধারার সংশোধনী নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই ধারা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। DNPA-র দাবি, সংশোধিত বিধান তথ্যের অধিকার এবং জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সংগঠনটি ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩-এর একাধিক ধারা এবং সংশ্লিষ্ট বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণার আবেদন জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ ছাড় না থাকায় সংবাদ প্রকাশক, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, সম্মতি গ্রহণ, সম্মতি প্রত্যাহার এবং তথ্য মুছে ফেলার মতো একাধিক বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে হতে পারে।
এর ফলে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা সরকারি কাজকর্মে অসদাচরণ নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় সাংবাদিকদের সমস্যায় পড়তে হবে। কারণ, এই ধরনের তদন্তে অনেক সময় সেই ব্যক্তিদের সম্পর্কেই ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যাঁদের কাজকর্ম নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই বিধানগুলি সংবাদসূত্রের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জানার অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিচারপতি কে এস পুট্টস্বামীর মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ের উল্লেখ করেছে DNPA। ওই রায়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনটির বক্তব্য, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনসাধারণের জানার অধিকারও সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
DNPA-র আবেদনে সংবিধানের ১৪, ১৯(১)(ক), ১৯(১)(জি) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদগুলি যথাক্রমে সাম্যের অধিকার, বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে।
এ ছাড়া ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের ৪৪(৩) ধারা, ৩৬ ও ৩৭ নম্বর ধারা এবং DPDP বিধির ২৩ নম্বর বিধি ও সপ্তম তফসিলকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। DNPA-র দাবি, ৩৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার তথ্য সংরক্ষণকারী সংস্থা ও মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তথ্য চাইতে পারে। কিন্তু এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা, বিচারবিভাগীয় নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগাম জানানোর মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নেই।
উল্লেখ্য, DNPA-র সদস্যদের মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক১৮, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দু, টাইমস ইন্টারনেট, ইন্ডিয়া টুডে, জি মিডিয়া, এবিপি, মালয়ালা মনোরমা, মাতৃভূমি, অমর উজালা এবং ঈনাডু টেলিভিশন-সহ ২১টি ডিজিটাল সংবাদ প্রকাশক। সংগঠনটির আবেদনে আম্বানি ও আদানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন সংস্থাগুলিও রয়েছে।
তবে শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে বক্তব্য জানানোর সুযোগ না দিয়ে আইনের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে রাজি হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানান, অন্য পক্ষের বক্তব্য না শুনে স্থগিতাদেশ দেওয়া হবে না। তবে স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদনের উপর নোটিস জারি করা হয়েছে।
আগামী ১৭ নভেম্বরের শুনানিতে এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট হতে পারে।