‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে মোদির ‘সপ্তধারা’ রূপরেখা, সাত শক্তিতে জোর

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে মোদির ‘সপ্তধারা’ রূপরেখা, সাত শক্তিতে জোর
‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে মোদির ‘সপ্তধারা’ রূপরেখা, সাত শক্তিতে জোর
 
নয়াদিল্লি

২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশ বা ‘বিকশিত ভারত’-এ পরিণত করার লক্ষ্যে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে সামনে রেখে ‘সপ্তধারা’ সংস্কার কাঠামো ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, গতি শক্তি, প্রতিরক্ষা, সবুজ ও নীল অর্থনীতি এবং ভারতের সফট পাওয়ারকে দেশের উন্নয়নের সাতটি প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

প্রাচীন ‘সপ্তসিন্ধু’র প্রসঙ্গ তুলে মোদি বলেন, একসময় ভারতের শক্তির পরিচয় ছিল সাতটি নদীর প্রবাহে। এখন বিকশিত ভারত গড়তে দেশের প্রয়োজন নতুন শক্তির প্রবাহ। আগামী ৫ থেকে ৭ বছরে এই সাত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে নতুন উচ্চতা, গতি এবং নতুন লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা দিতে হবে বলেও তিনি জানান।
 
উৎপাদন শক্তিই প্রথম ধারা
 
‘সপ্তধারা’র প্রথম শক্তি হিসেবে উৎপাদন ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেন মোদি। ছোট যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বড় পণ্য, সব ক্ষেত্রেই ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
 
ডিজাইন থেকে উৎপাদন পর্যন্ত সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল ভারতে গড়ে তুলে বিশ্বস্ত বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে দেশের অবস্থান শক্ত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে খরচ, গুণমান এবং উৎপাদনের পরিমাণ, এই তিন ক্ষেত্রেই বিশ্বমান অর্জন করতে হবে বলে জানান তিনি।
 
উৎপাদক, শিল্পোদ্যোগী এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলির উদ্দেশে মোদি বলেন, বিশ্ববাজারে ভারতীয় পণ্যের পরিচয় হতে হবে বিশ্বাস ও গুণমানের ভিত্তিতে।
 
কৃষি থেকে রফতানি বাজারে

দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণকে তুলে ধরেন মোদি। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় কৃষকদের সামনে যে বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার খুলেছে, তার সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
 
‘খামার থেকে রফতানি বাজারে’ পৌঁছনোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাজরা, মশলা, ফল, ফুল এবং রাসায়নিকমুক্ত কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারলে সেগুলিকে বিশ্ববাজারে শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
 
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিশ্বনেতৃত্বের লক্ষ্য
 
‘সপ্তধারা’র তৃতীয় শক্তি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, রোবোটিক্স এবং ডেটা সেন্টারের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে ভারতকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন মোদি।
 
UPI এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ভারতের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি ভারতীয় ডিজিটাল প্রযুক্তিকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
 
ভারতের নিজস্ব ৬জি প্রযুক্তি তৈরির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া ৬জি’ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়াই ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
 
গতি শক্তিতে দ্রুত ও আধুনিক যোগাযোগ
 
চতুর্থ শক্তি হিসেবে গতি শক্তি-কে সামনে আনেন মোদি। দেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি পণ্য, পরিষেবা ও মানুষের দ্রুত চলাচলের জন্য উন্নত পরিকাঠামো তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
 
বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়নের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বন্দরগুলি শুধুমাত্র পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এগুলিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে।
 
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার ডাক
 
পঞ্চম শক্তি হিসেবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে ভারতকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর করার আহ্বান জানান মোদি। বিশ্বের কাছে শুধু বাজার হয়ে না থেকে ভারতকে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে বলে জানান তিনি।
 
হাইপারসনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব নেওয়ার পাশাপাশি ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তায় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা ভারতের কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
 
সবুজ ও নীল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
 
‘সপ্তধারা’র ষষ্ঠ শক্তি হল সবুজ ও নীল অর্থনীতি। সবুজ হাইড্রোজেন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, শক্তি সঞ্চয়, পরিবেশবান্ধব যানবাহন এবং গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিশ্বমানের সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দেন মোদি।
 
এই ক্ষেত্রগুলিতে বিপুল সংখ্যক গ্রিন জব বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তিনি জানান।
 
একইসঙ্গে ভারতের দীর্ঘ উপকূলরেখাকে কাজে লাগিয়ে মৎস্যচাষ, উপকূলীয় পর্যটন এবং সমুদ্র প্রযুক্তির মাধ্যমে নীল অর্থনীতির বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
 
সফট পাওয়ারে ভারতের বৈশ্বিক প্রভাব
 
সপ্তম শক্তি হিসেবে ভারতের সফট পাওয়ার-এর কথা তুলে ধরেন মোদি। বিশ্বজুড়ে যোগের জনপ্রিয়তা, ভারতের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র, আয়ুর্বেদ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যচর্চাকে ভারতের বড় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
 
এছাড়া ‘হিল ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ, হস্তশিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, VFX, অ্যানিমেশন, গেমিং এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মতো ক্ষেত্রগুলিতে ভারত বৈশ্বিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে জানান মোদি।
 
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রেও আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভারতের বিপুল বনসম্পদ এবং ১০০টিরও বেশি জাতীয় উদ্যান থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটনের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
 
‘সপ্তধারা’ হবে সমন্বিত উন্নয়নের ভিত্তি
 
মোদি স্পষ্ট করে দেন, ‘সপ্তধারা’র সাতটি ক্ষেত্রকে আলাদা আলাদা উদ্যোগ হিসেবে দেখা যাবে না। দেশের উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে এগুলিকে সমন্বিত ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
 
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, সাত শক্তির সম্মিলিত ক্ষমতাই ভারতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে দেশের অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।


শেহতীয়া খবৰ