পুরুলিয়ায় বিরল মৃত্তিকা খনিজের খননে বড় পদক্ষেপ, প্রথমবার বাংলায় রেয়ার আর্থ ব্লকের নিলাম শুরু করছে কেন্দ্র

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 7 d ago
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
 
কলকাতা

বাংলায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে বিরল মৃত্তিকা মৌল বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (Rare Earth Elements-REE) উত্তোলনের পথে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র সরকার। ভারত সরকারের খনি মন্ত্রক চলতি মাসের ১৫ তারিখে পুরুলিয়ার একটি রেয়ার আর্থ ব্লকের ই-নিলামের আদেশনামা জারি করেছে। এর ফলে রাজ্যে এই প্রথম কোনও বৃহৎ রেয়ার আর্থ খনিজ ব্লক বাণিজ্যিক খননের জন্য নিলামের আওতায় আসতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং দেশের কৌশলগত খনিজ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
 
ঝাড়খণ্ড সীমান্ত সংলগ্ন পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল অঞ্চলের পুরুলিয়া-২ ব্লকের বেলমা গ্রাম পঞ্চায়েতের কালাপাথর ও রঘুডি গ্রামে এই মূল্যবান খনিজ ভাণ্ডারের সন্ধান মিলেছে। বিশ্বের অন্যতম দুষ্প্রাপ্য এই খনিজের সবচেয়ে বড় মজুত রয়েছে চিনে। এছাড়া ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতেও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস পাওয়া যায়।
 
কেন্দ্র সম্প্রতি ২০টি খনিজ প্রকল্পের নিলামের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রেয়ার আর্থ ব্লকের ই-নিলাম শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। একই সময়ে রাজ্যে সোনার সম্ভাবনাময় ভাণ্ডারের সন্ধানেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি।
 
রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস মূলত ১৭টি বিরল ধাতব মৌলের একটি বিশেষ গোষ্ঠী। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এই খনিজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা, নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতে এই খনিজ অপরিহার্য। ফলে এই খনিজের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে রাজ্য ও কেন্দ্র, উভয়েরই রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
 
খনি মন্ত্রকের অধীনস্থ ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (জিএসআই)-র অনুসন্ধানেই পুরুলিয়ায় এই রেয়ার আর্থ ভাণ্ডারের সন্ধান মেলে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় প্রায় ০.৬৭ মিলিয়ন টন রেয়ার আর্থ সম্পদের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে।
 
দেশে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্র ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন চালু করে। এই মিশনের লক্ষ্য খনিজ অনুসন্ধান, খনন, প্রক্রিয়াকরণ এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে দেশের ক্রিটিক্যাল মিনারেল ভ্যালু চেনকে আরও শক্তিশালী করা এবং এই ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা।
 
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পূর্ববর্তী রাজ্য সরকার পুরুলিয়ার কালাপাথর-রঘুডি রেয়ার আর্থ ব্লক সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো কেন্দ্রকে সরবরাহ না করায় দীর্ঘদিন নিলাম প্রক্রিয়া আটকে ছিল। এর ফলে জাতীয় উন্নয়নের পাশাপাশি রাজ্যের শিল্পায়ন এবং শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
 
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের আগস্টে রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি মন্ত্রী জি. কিশন রেড্ডির কাছে পশ্চিমবঙ্গের বিরল মৃত্তিকা খনিজের সম্ভাবনা ও অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিলেন।
 
বর্তমান অর্থবর্ষে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়ে নতুন অনুসন্ধান প্রকল্প শুরু করেছে জিএসআই। পাশাপাশি দার্জিলিংয়েও এই বিরল খনিজের সন্ধান চলছে। সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, কালিম্পং এলাকায় সোনারও সন্ধান মিলতে পারে।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, কালাপাথর-রঘুডি ছাড়াও গোলামারা-বারুডি, পশ্চিম কালাপাথর এবং কোটশিলার খটঙ্গার উত্তর অংশেও রেয়ার আর্থ খনিজের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কেরল ও তামিলনাড়ুতেও এই মূল্যবান খনিজের মজুত রয়েছে। বাংলায় এর বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হলে দেশের কৌশলগত খনিজ সম্পদের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।