গঙ্গার বুকে মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই, অদৃশ্য নায়কদের সম্মান বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবসে
কলকাতা
কলকাতার গঙ্গায় প্রতিটি দিনই শুরু হয় এক অনিশ্চিত দায়িত্ব নিয়ে। কোথাও কেউ তলিয়ে গিয়েছেন, কোথাও আবার নদীর স্রোতে ভেসে উঠেছে অজ্ঞাতপরিচয় দেহ। এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই জীবনকে বাজি রেখে কাজ করে চলেছেন কলকাতা রিভার ট্রাফিক গার্ডের ডুবুরিরা। বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবসে সেই অদৃশ্য নায়কদেরই সম্মান জানানো হল চেতলা অহীন্দ্র মঞ্চে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রিভার ট্রাফিক গার্ডের চার অভিজ্ঞ ডুবুরি, বাবলু রায়, অনুপকুমার বেরা, তন্ময় বিশ্বাস এবং মহম্মদ ইসমাইল। তাঁদের অধিকাংশ কাজই করতে হয় প্রায় ৬০ ফুট গভীর জলের নিচে। কলকাতা রিভার ট্রাফিক গার্ডে বর্তমানে মোট ৪৩ জন প্রশিক্ষিত ডুবুরি কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকেই চারজনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
রিভার ট্রাফিক গার্ডের সাব-ইন্সপেক্টর দেবাশিস বৈদ্য জানান, কোন্নগর থেকে বজবজ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় চারটি মৃতদেহ উদ্ধার হয় গঙ্গা থেকে। উদ্ধার হওয়া দেহগুলি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তর বন্দর, ওয়েস্ট পোর্ট বা সাউথ পোর্ট থানার অধীনে তদন্ত এগোয়।
তবে এই পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারত উৎসবের মরশুমে। বিশেষ করে দুর্গাপুজো এবং ছটপুজোর সময় নদীর ঘাটে মানুষের ভিড় বহুগুণ বেড়ে যায়। ডুবুরিদের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেকেই মদ্যপ অবস্থায় ঘাটে এসে ভারসাম্য হারিয়ে জলে পড়ে যান। দ্রুত তৎপরতা এবং ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার অভিযানের ফলেই বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়।
দেবাশিস বৈদ্যের কথায়, “গঙ্গাকে কখনও পুকুর বা সুইমিং পুল ভেবে নামা উচিত নয়। সাঁতার না জেনে নদীতে নামা অত্যন্ত বিপজ্জনক।” তাঁর আবেদন, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ঘাটে গেলে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। সম্প্রতি গঙ্গা থেকে এক সদ্যোজাতের দেহ উদ্ধারের ঘটনাও সেই সতর্কবার্তাকেই আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
নদীতে কেউ ডুবে গেলে সময়ের সঙ্গে শুরু হয় লড়াই। সেই মুহূর্তে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর দায়িত্ব পালন করেন জেট স্কি চালক হাবিবুল্লা। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর দ্রুত পদক্ষেপই উদ্ধার অভিযানের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।
বিশ্ব জলে ডোবা প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আধিকারিক ডা. ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য। অনলাইনে বক্তব্য রাখেন সংস্থার অধিকর্তা ডা. সমীর চৌধুরি। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মৈপীঠ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান জ্যোৎস্না হালদার।
অনুষ্ঠান থেকে বারবার উঠে আসে একটাই বার্তা, সচেতনতা এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা থাকলেই জলে ডুবে মৃত্যুর মতো বহু দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। আর সেই লড়াইয়ের প্রথম সারিতে রয়েছেন কলকাতা রিভার ট্রাফিক গার্ডের ডুবুরিরা, যাঁদের সাহস ও নিষ্ঠা প্রতিদিন অগণিত মানুষকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিচ্ছে।