পরিচয় হারালেও হারায়নি মানবিকতা! হাসপাতাল–হ্যাম রেডিয়ো পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে পরিবারের কাছে ফিরলেন দুই পরিযায়ী শ্রমিক
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন মানেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ছুটে চলা। কাজের তাগিদে ঘর ছাড়েন তাঁরা, অথচ বিপদে পড়লে অনেক সময় সেই ঘরেই খবর পৌঁছনোর পথটুকুও থাকে না। দুর্ঘটনায় পরিচয় হারিয়ে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে থাকা এমনই দুই পরিযায়ী শ্রমিককে শেষ পর্যন্ত তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করল শ্রীরামপুর।
একজন অসমের নগাঁও জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা তাইয়েবুর রহমান। অন্যজন ওড়িশার সুন্দরগড় জেলার পদ্মলোচন। পৃথক দু’টি ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়ে তাঁরা শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালে ভর্তি হন। দুর্ঘটনার পরে দু’জনেরই অবস্থা এমন ছিল যে নিজেদের পরিচয় কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। অচেতন অবস্থায় পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।
চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করলেও সামনে তখন আরও বড় সমস্যা—এই দুই মানুষকে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে কীভাবে?
সেখানেই শুরু হয় মানবিক উদ্যোগ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পুলিশ এবং হ্যাম রেডিয়োর স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁদের পরিবারের সন্ধানে তৎপর হয়ে ওঠেন। এক রাজ্যের মানুষকে অন্য রাজ্যে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করানো সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে হ্যাম রেডিয়ো।
হ্যাম রেডিয়ো কলকাতার প্রধান অম্বরিশ নাক জানান, ‘‘দুটি ভিন্ন রাজ্যেই আমাদের দলের লোকেরা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সুস্থভাবে পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি।’’
এই উদ্যোগের নেপথ্যে শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালের সুপার বাসুদেব জোয়ারদারের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হাসপাতালের তরফে অতিরিক্ত উদ্যোগ নিয়ে দুই পরিযায়ী শ্রমিককে তাঁদের পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তাঁদের যেন অচেনা শহরে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে না হয়, সে বিষয়েও নজর রাখা হয়।
তদন্তে জানা গিয়েছে, শ্রাবণ মাসের সোমবার তারকেশ্বরে পুণ্যার্থীদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণেই ট্রেনে এই দুই পরিযায়ী শ্রমিক পড়ে গিয়ে আহত হন। ভিড়ের চাপে ট্রেনে ওঠানামা কিংবা যাত্রার সময় অসাবধানতাই তাঁদের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু এই দুর্ঘটনার গল্পের শেষটা শুধুই দুর্ঘটনা নয়। বরং তার পরের ঘটনাই হয়ে উঠেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, দু’জনই ছিলেন ভিন্রাজ্যের শ্রমিক। কর্মসূত্রে নিজের রাজ্য থেকে বহু দূরে। দুর্ঘটনার পরে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো পরিবারের কেউ ছিলেন না আশপাশে। পরিচয়ও স্পষ্ট ছিল না। এমন অবস্থায় তাঁরা হয়তো আরও দীর্ঘ সময় অচেনা শহরের হাসপাতালেই পড়ে থাকতে পারতেন।
সেই জায়গায় পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করেছে, হাসপাতাল চিকিৎসা দিয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং হ্যাম রেডিয়ো ভিন্ন রাজ্যে থাকা স্বজনদের খুঁজে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়েছে। প্রশাসন, চিকিৎসা পরিষেবা এবং স্বেচ্ছাসেবী যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত দুই পরিযায়ী শ্রমিককে ফিরিয়ে দিয়েছে তাঁদের আপনজনের কাছে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময় তাঁদের শুধুই শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু তাইয়েবুর রহমান কিংবা পদ্মলোচনের মতো মানুষদেরও ঘরে অপেক্ষা করে থাকেন কেউ—মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাইবোন। কাজের জন্য তাঁরা ঘর থেকে দূরে থাকলেও তাঁদের জীবনের মূল্য পরিবারের কাছে অপরিসীম।
শ্রীরামপুরের এই ঘটনা তাই শুধুমাত্র দু’জন দুর্ঘটনাগ্রস্ত শ্রমিককে বাড়ি পাঠানোর খবর নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, পরিচয় হারিয়ে গেলেও একজন মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্ব হারিয়ে যায় না।
আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই দুই ভিন্রাজ্যের অচেনা মানুষকে আপনজনের কাছে ফিরিয়ে দিল পুলিশ, হাসপাতাল এবং হ্যাম রেডিয়োর সম্মিলিত মানবিক উদ্যোগ। আজকের ব্যস্ত, স্বার্থকেন্দ্রিক সময়ে এই ছোট্ট ঘটনাই যেন বড় করে বলে যায়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবসময় পরিচয় লাগে না, লাগে শুধু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতা।