আশা খোসা / নয়াদিল্লি
২০২৫ সাল ভারতের ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখে যাওয়া বছর। যে বিশ্ব এতদিন ভারতকে দেখত চা, যোগব্যায়াম ও সাংস্কৃতিক সৌম্যতার প্রতীক হিসেবে, এক নরম শক্তির দেশ হিসেবে; তারা হঠাৎই এক দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভীক ভারতের মুখোমুখি হলো। পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসবাদকে লালনকারী প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করা থেকে শুরু করে প্রয়োজনে বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানা, সব মিলিয়ে ভারত স্পষ্ট করে দিল, উসকানি দিলে আর নীরব দর্শক হয়ে থাকা নয়।
মে মাসে পরিচালিত অপারেশন সিন্দুর ছিল সেই বদলে যাওয়া ভারতের উচ্চারণ। এটি পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিল যে সীমান্তপারের সন্ত্রাসের প্রশ্নে ভারতের নীতি আপসহীন, শূন্য সহনশীলতা। একই সঙ্গে বিশ্বকেও একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে গেল; যখন আন্তর্জাতিক মহল এখনো রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষিত সন্ত্রাসবাদকে স্বীকার করতে দ্বিধায়, তখন ভারত নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করবে।
ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ভ্যোমিকা সিং
এই অভিযান যতটা অপ্রত্যাশিত ছিল বিশ্বের কাছে, ততটাই বিস্ময় জাগিয়েছিল ভারতের সাধারণ মানুষের মনেও। ৭ মে সকালে যখন সামরিক নেতৃত্ব জানাল যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নয়টি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে সফল আঘাত হানা হয়েছে, তখন যেন এক নতুন আত্মপরিচয় পেল দেশ। এই ছিল সেই ভারত, যে আর শুধু শোক প্রকাশ বা নিন্দার ভাষায় আটকে থাকে না, বরং আঘাতের উৎসকেই নিশ্চিহ্ন করে।
২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় হামলার রক্তাক্ত স্মৃতিই ছিল অপারেশন সিন্দুরের পটভূমি। দক্ষিণ কাশ্মীরের এক শান্ত উপত্যকায় পাকিস্তান-সমর্থিত লস্কর-ই-তইবার সন্ত্রাসীরা ২৬ জন নিরপরাধ পর্যটককে হত্যা করেছিল। এই ঘটনার জবাবে ভারতের পদক্ষেপ ছিল সাহসী, সুপরিকল্পিত এবং স্পষ্ট লক্ষ্যনির্ভর, যা বহুদিন ধরে ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়া “দুর্বল রাষ্ট্র”-এর তকমাকে মুছে দেয়।
প্রতীকী ছবি
এই অভিযানের উপস্থাপনাও ছিল প্রতীকী। দৈনিক ব্রিফিংয়ে দুই নারী সামরিক অফিসারের দৃপ্ত উপস্থিতি, আক্রমণের আগে স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা, আকাশ ও ব্রহ্মোসের মতো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে হামলার সরাসরি চিত্র তুলে ধরা, সব মিলিয়ে এক আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী ও আধুনিক ভারতের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপারেশন সিন্দুর কেবল দেশের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগায়নি, বরং পাকিস্তান ও অন্য সম্ভাব্য শত্রুদের জন্যও নতুন “রেড লাইন” টেনে দিয়েছে। এত নিখুঁত ও দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযানটি সম্পন্ন হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রায় সর্বসম্মত সমর্থনই মিলেছে।
রাজনীতির ময়দানেও বছরটি ছিল ঘটনাবহুল। ভারতীয় জনতা পার্টি দিল্লিতে বড় জয় ছিনিয়ে নেয় এবং বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএকে ক্ষমতায় আনে। বছরের শেষ দিকে কেরালার স্থানীয় সংস্থা নির্বাচনে বিজেপির অগ্রগতি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; যে রাজ্যে একসময় দলটিকে বামপন্থী রাজনীতির বাইরে রাখা হতো। অন্যদিকে, কংগ্রেস পার্টির রাজনৈতিক অবক্ষয় আরও স্পষ্ট হয়েছে। একের পর এক পরাজয়ের পরও না কৌশলে পরিবর্তন, না নেতৃত্বে; যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক।
এই বছরের এক রহস্যময় রাজনৈতিক ঘটনা ছিল উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের আকস্মিক পদত্যাগ। প্রায় অর্ধেক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর নীরব প্রস্থান সেপ্টেম্বরে নতুন নির্বাচন ডেকে আনে, যেখানে এনডিএ প্রার্থী সি.পি. রাধাকৃষ্ণন ভারতের ১৫তম উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ধনখড়ের পদত্যাগের কারণ আজও অজানা, সরকার বা স্বয়ং ধনখড় কেউই এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।
দেশের মুসলমান সমাজকে প্রভাবিত করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ওয়াকফ (সংশোধন) আইন, ২০২৫। সরকার এই আইনকে ওয়াকফ সম্পত্তির অপব্যবহার ও দুর্নীতি রুখতে প্রয়োজনীয় সংস্কার হিসেবে তুলে ধরলেও, বিরোধী দল ও বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন একে ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দেয়। এই আইন দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বছরটি উদ্বেগও বাড়িয়েছে। লালকেল্লায় বিস্ফোরণ এবং তার পরবর্তী তদন্তে ঘরোয়া উগ্রপন্থী সন্ত্রাসবাদের ভয়ংকর চিত্র সামনে আসে। চিকিৎসক কিংবা বোরখা পরা নারীদের মতো সমাজের শিক্ষিত অংশের মানুষদের সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ার তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কাশ্মীরে আপাত শান্তি থাকলেও, সেখানকার যুবকদের ব্যবহার করে দেশের অন্য অংশে সন্ত্রাস ছড়ানোর চেষ্টাও সামনে এসেছে, যা অভিভাবক থেকে প্রশাসন, সবার উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সম্প্রতি জম্মু থেকে গ্রেফতার হওয়া এক কিশোরের ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। NEET কোচিংয়ের নামে তাকে পাঠানো হয়েছিল, অথচ তাকে গড়ে তোলা হচ্ছিল এক আত্মঘাতী হামলাকারী হিসেবে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখানো সেই কিশোরকে বোমা-জ্যাকেট পরানোর প্রস্তুতি চলছিল, যা সমাজের সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন রেখে যায়।
লালকেল্লা ভয়ানক বিস্ফোরণের একটি দৃশ্য
অর্থনীতির ময়দানে অবশ্য ভারত স্থির থেকেছে নিজের গতিপথে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মার্কিন শুল্কনীতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতির তালিকায় শীর্ষে থাকবে।
আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। শ্রীহরিকোটা থেকে GSLV-F15/NVS-02 উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ইসরো তার ১০০তম লঞ্চের ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছে। পাশাপাশি, একটি বেসরকারি মিশনের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পা রেখে প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা ভারতের মহাকাশ অভিযাত্রায় গর্বের এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন।