দেবকিশোর চক্রবর্তী
শনিবার গভীর রাতে তৃতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিল নির্বাচন কমিশন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চালু করা হয়েছে ট্রাইবুনাল পোর্টাল, যার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকরা নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই শুরু করতে পারবেন। রবিবার থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এই আপিল প্রক্রিয়া, যা ইতিমধ্যেই রাজ্যের নানা প্রান্তে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য এবার থাকছে দ্বিমুখী সুযোগ, অনলাইন ও অফলাইন, দুই পথেই আবেদন জানানোর ব্যবস্থা। ডিজিটাল পদ্ধতিকে সহজতর করতে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বিশেষভাবে ‘Submit Appeal for Individuals (Under Adjudication)’ অপশন চালু করা হয়েছে। এই অপশনে ক্লিক করলেই আবেদনকারীর সামনে খুলে যাবে একটি নির্দিষ্ট পোর্টাল, যেখানে মোবাইল নম্বর বা এপিক (EPIC) নম্বর দিয়ে লগ-ইন করতে হবে।
লগ-ইনের পর আবেদনকারীকে একটি বিস্তারিত ফর্ম পূরণ করতে হবে। সেখানে বাদ পড়া ভোটারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পিনকোড-সহ সম্পূর্ণ ঠিকানা (২৫০ শব্দের মধ্যে), আপিলের সংক্ষিপ্ত বিবরণ (১০০০ শব্দের মধ্যে) এবং আবেদন করার কারণ (৫০০ শব্দের মধ্যে) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এই নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক করার চেষ্টা করেছে কমিশন। সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে জমা পড়লে তা ট্রাইবুনালের বিবেচনার জন্য গৃহীত হবে।
তবে শুধু ডিজিটাল নির্ভরতা নয়, বাস্তব পরিস্থিতির কথাও মাথায় রেখেছে প্রশাসন। যাঁরা অনলাইনে আবেদন করতে স্বচ্ছন্দ নন বা প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাঁদের জন্য অফলাইন ব্যবস্থাও সমানভাবে খোলা রাখা হয়েছে। জেলা শাসক, অতিরিক্ত জেলা শাসক কিংবা মহকুমা শাসকের দপ্তরে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে সরাসরি আবেদন করা যাবে। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন যেন কারও অধিকারপ্রাপ্তিতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা হয়েছে।
এদিকে, ট্রাইবুনালের কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। ইতিমধ্যেই ২৩টি জেলার জন্য ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতি ও অভিজ্ঞ বিচারকদের নিয়ে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। এই ট্রাইবুনালগুলির কাজ হবে জমা পড়া আবেদনগুলি খতিয়ে দেখা, প্রয়োজনীয় শুনানি করা এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। মূল লক্ষ্য একটাই, কোনও প্রকৃত ভোটার যেন প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। ভোটাধিকার শুধুমাত্র একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। সেই অধিকার সুরক্ষিত রাখতে একটি নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। ট্রাইবুনাল চালুর মাধ্যমে সেই প্রয়োজনীয়তাকেই পূরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে ইতিবাচকতার পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও সামনে আসছে। বিশেষ করে, আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। আবেদন জমা দেওয়ার পর কত দ্রুত তা নিষ্পত্তি হবে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা এখনও সামনে আসেনি। একইসঙ্গে, গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল সচেতনতার অভাব থাকায় অফলাইন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও সহজলভ্য করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে অধিকাংশ মহলই স্বাগত জানিয়েছে। এখন নজর থাকবে, বাস্তব ক্ষেত্রে এই ট্রাইবুনাল কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং বাদ পড়া ভোটারদের সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে সক্ষম হয় কি না। গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, ভোটাধিকার, রক্ষায় এই পদক্ষেপ কতটা সফল হয়, সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।