ভিক্টোরিয়ার বুকে ‘দুর্গা’র বিজয়, এক বছরে ১.৭ কিমি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নতুন ইতিহাস কলকাতা মেট্রোর

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
ভিক্টোরিয়ার বুকে ‘দুর্গা’র বিজয়, এক বছরে ১.৭ কিমি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নতুন ইতিহাস কলকাতা মেট্রোর
ভিক্টোরিয়ার বুকে ‘দুর্গা’র বিজয়, এক বছরে ১.৭ কিমি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নতুন ইতিহাস কলকাতা মেট্রোর
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

কলকাতা মেট্রোর ইতিহাসে আরও এক গর্বের অধ্যায়। জোকা–ইডেন গার্ডেন্স মেট্রো করিডরের নির্মাণে বড় সাফল্য এনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) ‘দুর্গা’। প্রায় এক বছরের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমে ভূগর্ভে ১.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নির্মাণ করে লক্ষ্যপূরণ করল অত্যাধুনিক এই যন্ত্র। সবচেয়ে বড় কথা, এত সংবেদনশীল এলাকায় কাজ হলেও কোথাও কোনও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা বিপর্যয়ের খবর মেলেনি। মেট্রো রেলের দাবি, পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার সমন্বয়েই সম্ভব হয়েছে এই সাফল্য।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো প্রায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণ ছিল প্রকৌশলীদের কাছে অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। ভূগর্ভের মাটির গঠন, জলস্তর, পুরনো নির্মাণ এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা, সব মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সতর্কতার। সেই কারণেই বুধবার টিবিএম ‘দুর্গা’ যখন সফলভাবে স্টেশনের শ্যাফটে বেরিয়ে আসে, তখন উপস্থিত ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ ও শ্রমিকদের মুখে ধ্বনিত হয় ‘বন্দে মাতরম’। করতালি আর উচ্ছ্বাসে তাঁরা উদযাপন করেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
 
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশনে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) ‘দুর্গা’
 
কলকাতা মেট্রোর দীর্ঘ ইতিহাসে এমন সাফল্যের তাৎপর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালে দেশের প্রথম মেট্রো পরিষেবা শুরু হয়েছিল এই শহরেই। তারপর চার দশকে বহু নতুন করিডর নির্মিত হলেও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ খননের ক্ষেত্রে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পে বউবাজার এলাকায় সুড়ঙ্গ নির্মাণের সময় চারবার বড় বিপর্যয় নেমে আসে। মাটি ধসে বহু বাড়িতে ফাটল ধরে, শতাধিক পরিবারকে ঘরছাড়া হতে হয়, দীর্ঘদিন ব্যাহত হয় নির্মাণকাজ। সেই অভিজ্ঞতা এখনও কলকাতার নাগরিকদের স্মৃতিতে তাজা।
 
ফলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নিচে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শুরুর আগে থেকেই আশঙ্কা ছিল প্রবল। শুধু সাধারণ মানুষ নন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের একাংশও নজর রাখছিলেন প্রকল্পের অগ্রগতির দিকে। সেই সমস্ত আশঙ্কাকে কার্যত মিথ্যা প্রমাণ করে কোনওরকম ক্ষতি ছাড়াই সুড়ঙ্গ নির্মাণ শেষ হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ।
 
মেট্রোর এক শীর্ষ আধিকারিক বলেন, “এই সাফল্য শুধু একটি টানেল সম্পূর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়। এটি আমাদের প্রকৌশল দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি এবং দীর্ঘ পরিকল্পনার বাস্তব রূপ। প্রতিটি ইঞ্চি পথ খুঁড়তে আমরা আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ব্যবহার করেছি। ভূপৃষ্ঠে সামান্য নড়াচড়াও নজরে রাখা হয়েছে। সেই কারণেই কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।”
 
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক প্রবীণ প্রকৌশলীর কথায়, “বউবাজারের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। সেই শিক্ষা থেকেই প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভিক্টোরিয়ার নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খনন ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর কাজ। আজকের এই সাফল্য গোটা দলের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।”
 
টিবিএম ‘দুর্গা’র অপারেশন টিমের এক সদস্য বলেন, “প্রতিদিন কয়েক মিটার করে এগিয়েছে যন্ত্রটি। বাইরে থেকে বিষয়টি যত সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার প্রতিটি ধাপ ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। আজ মেশিনটি বেরিয়ে আসার মুহূর্ত আমাদের কাছে আবেগের।”
 
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জোকা–ইডেন গার্ডেন্স করিডর চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতার সঙ্গে শহরের কেন্দ্রস্থলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে সড়কপথের যানজট কমবে এবং গণপরিবহনের উপর মানুষের নির্ভরতা বাড়বে। ভবিষ্যতে এই করিডর শহরের মেট্রো নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথে পরিণত হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
বর্তমানে এই করিডরের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ দ্রুত এগোচ্ছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের আশা, টানেল নির্মাণের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পূর্ণ হওয়ায় পরবর্তী পর্যায়ের ট্র্যাক বসানো, বিদ্যুৎ ও সিগন্যালিংয়ের কাজও দ্রুত শুরু করা যাবে।
 
বউবাজারের বেদনাদায়ক স্মৃতি পেরিয়ে ভিক্টোরিয়ার মাটির নিচে ‘দুর্গা’র এই বিজয় তাই শুধু একটি প্রকল্পের অগ্রগতি নয়; এটি কলকাতা মেট্রোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রতীক। শহরের পাতালপথে লেখা হল আরও এক নতুন ইতিহাস।


শেহতীয়া খবৰ