কলকাতা:
গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান ও সামুদ্রিক গবেষণায় ভারতের সক্ষমতা আরও বাড়াতে কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স বা জিআরএসই বুধবার জলে নামাল অত্যাধুনিক দেশীয় মহাসাগর গবেষণা জাহাজ ‘সাগর মন্থন’। জাতীয় মেরু ও মহাসাগর গবেষণা কেন্দ্রের জন্য তৈরি এই জাহাজটি ভারতের ‘ডিপ ওশান মিশন’-এর অধীনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাহাজটির নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা এবং ২০২৮ সালের গোড়ার দিকে এটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা। কলকাতার রিষি বঙ্কিম শিপইয়ার্ডে জাহাজটির নির্মাণকাজ হয়েছে। কিল বসানোর মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই জলে নামানোয় নির্ধারিত সময়ের আগেই গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণপর্ব সম্পন্ন করার নজির তৈরি করেছে জিআরএসই।
৮৯.৫ মিটার লম্বা ও ১৮.৮ মিটার চওড়া ‘সাগর মন্থন’-এর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৫,৯০০ টন। জাহাজটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৪ নট। উত্তাল সমুদ্রেও গবেষণার কাজ চালানোর মতো করে এটি নকশা করা হয়েছে। ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে দক্ষিণ মহাসাগর এবং অ্যান্টার্কটিকার আশপাশের জলসীমাতেও গবেষণা চালাতে পারবে এই জাহাজ।
জাহাজটিতে থাকবে অত্যাধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান ও ভূ-পদার্থবিদ্যার গবেষণা ব্যবস্থা। সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, ভূকম্পন, সমুদ্রের গভীরতা, জলের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা, জল ও সামুদ্রিক জীবের নমুনা সংগ্রহ-সহ নানা ধরনের গবেষণা করা যাবে। ৬ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত সমুদ্রতল সমীক্ষা চালানোর সক্ষমতাও থাকবে।
এছাড়াও ‘সাগর মন্থন’ থেকে স্বয়ংক্রিয় জলযান বা এএইউভি এবং দূরনিয়ন্ত্রিত জলযান বা আরওভি সমুদ্রে নামানো ও ফিরিয়ে আনা যাবে। সমুদ্রতলে নমুনা সংগ্রহ, পাথর উত্তোলন, তথ্যবাহী ভাসমান যন্ত্র স্থাপন, গভীর সমুদ্রের মুরিং ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মতো কাজও করা সম্ভব হবে। জাহাজে গবেষণাগার থাকায় সমুদ্রযাত্রার সময়ই বিজ্ঞানীরা সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবেন।
পৃথিবীবিজ্ঞান মন্ত্রকের সচিব শ্রীনিবাস কুমার তুম্মালা জানিয়েছেন, এই জাহাজ ভারতীয় বিজ্ঞানীদের ভারত মহাসাগর ও তার বাইরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গবেষণার সুযোগ আরও বাড়াবে। একইসঙ্গে সমুদ্রের তলদেশে থাকা ম্যাঙ্গানিজ নডিউল ও পলিমেটালিক সালফাইডের মতো সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং জাহাজটির উদ্বোধনকে ভারতের সমুদ্রবিজ্ঞান ও স্বনির্ভর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ‘সাগর মন্থন’ ভারতের গবেষণা বহরে বড় সংযোজন হবে এবং সামুদ্রিক সম্পদ, জলবায়ু, পরিবেশ, জাহাজ চলাচল, শক্তি ও নীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করবে।
‘সাগর মন্থন’ তাই শুধু একটি গবেষণা জাহাজ নয়—ভারতের সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান, সম্পদ ও পরিবেশগত রহস্য অনুসন্ধানের জন্য দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এক নতুন গবেষণামঞ্চ।