শিশুর হাসিতে কৃষ্ণভক্তি, সেবার বার্তায় নতুন বাংলা: জন্মাষ্টমীতে শিশুদের মাঝে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
দেবকিশোর চক্রবর্তী
জন্মাষ্টমীর পুণ্যপ্রভাতে ভক্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অন্য ছবি ধরা পড়ল বাংলায়। শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিকে সামনে রেখে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিশুদের কোলে তুলে নেওয়া, তাদের সঙ্গে স্নেহের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এবং ছোটদের মুখে হাসি ফোটানোর এই দৃশ্য জন্মাষ্টমীর আবহকে যেন আরও প্রাণবন্ত করে তুলল।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই দিনটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, মানবিকতা, ভালোবাসা এবং কর্তব্যবোধের প্রতীক। সেই আবহেই শিশুদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর এই সময় কাটানোকে অনেকেই দেখছেন মানবিকতার এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ হিসেবে। বিশেষ করে শিশুদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক মেলামেশার ছবি উৎসবের আবেগকে আরও গভীর করেছে।
এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের অমর বাণী স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে, “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করার যে দর্শন বিবেকানন্দ তুলে ধরেছিলেন, শিশুদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসার এই দৃশ্য সেই মানবিক দর্শনেরই প্রতীকী প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে।
শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ। তাদের মুখে হাসি, তাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা, সুস্থ পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে পরিচয়, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বিষয়গুলির গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে জন্মাষ্টমীর মতো একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবে শিশুদের সামনে রেখে যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর সামাজিক বার্তাও বহন করছে।
২০২৬ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। ৯ মে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সরকারি নথিতেও তাঁকেই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জন্মাষ্টমীর সকালে তাঁর শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ঘটনাকে ঘিরে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে, বাংলার জনজীবনে সনাতনী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন ধরনের আবহ। কৃষ্ণের বাঁশি, গোপালরূপ, রাধাকৃষ্ণের ভক্তি, কীর্তন, শঙ্খধ্বনি কিংবা জন্মাষ্টমীর বিভিন্ন আচার, সব মিলিয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এই দিনটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবেগে পালিত হয়। তার সঙ্গে শিশুদের যুক্ত করা হলে সেই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
তবে সনাতনী সংস্কৃতির এই আবহকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও গীতার দর্শনে কর্তব্য, ন্যায়, আত্মসংযম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার যে শিক্ষা রয়েছে, তা সর্বজনীন। সেই কারণেই জন্মাষ্টমীর মতো উৎসব সমাজে সম্প্রীতি, মানবিকতা ও নৈতিকতার বার্তা ছড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে।
শিশুদের কোলে তুলে নেওয়ার দৃশ্য তাই নিছক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির ছবি নয়, এটি অনেকের কাছে এক মানবিক মুহূর্ত। রাজনীতির ব্যস্ততা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে একজন জনপ্রতিনিধিকে যখন শিশুদের সঙ্গে সহজ-সরল পরিবেশে দেখা যায়, তখন মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগের অন্য একটি দিকও সামনে আসে।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন প্রযুক্তি ও দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার কারণে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তখন জন্মাষ্টমীর মতো উৎসব শিশুদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। সেই আবহে মুখ্যমন্ত্রীর শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ঘটনাটি প্রতীকী গুরুত্বও বহন করছে।
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ভক্তি ও মানবিকতা বরাবরই পাশাপাশি চলেছে। চৈতন্যদেবের প্রেম ও ভক্তির দর্শন থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের মানবসেবার আদর্শ, বাংলার সমাজজীবনে ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে মানবকল্যাণের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জন্মাষ্টমীর সকালে শিশুদের প্রতি স্নেহের এই প্রকাশ সেই ঐতিহ্যের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
সব মিলিয়ে, কৃষ্ণজন্মের আনন্দ, শিশুদের নির্মল হাসি এবং মানবিকতার বার্তা, এই তিনের মেলবন্ধনে জন্মাষ্টমীর সকাল পেল বিশেষ মাত্রা। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলায় সনাতনী সংস্কৃতিকে ঘিরে যে নতুন আবহের কথা আলোচনায় আসছে, এই দৃশ্য তারই একটি প্রতীকী ছবি হয়ে উঠতে পারে। আর স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়ার যে শিক্ষা, শিশুর নিষ্পাপ মুখে হাসি ফোটানো তারই এক সহজ, সরল এবং সুন্দর প্রকাশ।