শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
জামাইষষ্ঠী মানেই বাঙালি পরিবারের এক বিশেষ আবেগের দিন। শ্বশুরবাড়ির আদর-আপ্যায়ন, মাছ-মিষ্টির আয়োজন আর হাসি-আনন্দে ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু নদিয়ার সীমান্তবর্তী চর মেঘনায় এই উৎসবের ছবি একেবারেই আলাদা। এখানে শ্বশুরবাড়িতে যেতে জামাইদের সঙ্গে রাখতে হয় ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড। কারণ, তাঁদের পেরোতে হয় আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের গেট।
নদিয়ার করিমপুর-১ ব্লকের চর মেঘনা এমন একটি গ্রাম, যা ভারতের ভেতরে হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যার মুখোমুখি। গ্রামের এক প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলেছে মাথাভাঙা নদী, আর নদীর ওপারেই বাংলাদেশ। ফলে গ্রামে প্রবেশের আগে বিএসএফের আউটপোস্টে পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, দর্শনার্থী কতদিন গ্রামে থাকবেন, তাও নথিভুক্ত করতে হয়।
এই নিয়মের ব্যতিক্রম নন জামাইরাও। তাই জামাইষষ্ঠীর আগে শ্বশুরদের প্রথম প্রশ্ন হয়, ‘ভোটার আর আধার কার্ড নিয়েছ তো?’ তারপরেই শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি।
জামাইরা যখন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন, তাঁদের হাতে থাকে রসগোল্লার হাঁড়ি, বড় মাছ আর ব্যাগপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র। কাঁটাতারের এক পাশে অপেক্ষা করেন তাঁরা, আর অন্য পাশে অপেক্ষায় থাকেন শ্বশুর, শাশুড়ি বা শ্যালক। বিএসএফ জওয়ান পরিচয় যাচাই করে জানতে চান, তিনি কার জামাই এবং কতদিন থাকবেন। সব তথ্য মিলে গেলে তবেই খোলে লোহার গেট, আর শুরু হয় শ্বশুরবাড়ির পথে যাত্রা।
চর মেঘনার বাসিন্দাদের মতে, এই অভিজ্ঞতা তাঁদের কাছে বহু বছরের বাস্তবতা। সীমান্ত এলাকার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রতিটি পদক্ষেপেই রয়েছে বিধিনিষেধ। গ্রামের মানুষ নিজেদের ‘নিজভূমিতে পরবাসী’ বলেই মনে করেন। তাঁদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির কারণে গ্রামের ছেলেদের বিয়ে দিতেও অনেক সময় সমস্যা হয়। অনেক পরিবারই সীমান্তঘেরা এই অনিশ্চিত জীবনযাত্রায় মেয়েকে বিয়ে দিতে চান না।
২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময়ের সময় উত্তরবঙ্গের বহু এলাকার সমস্যার সমাধান হলেও চর মেঘনার পরিস্থিতি বিশেষ বদলায়নি। কারণ, সরকারি নথিতে এই গ্রামের পরিচয় ‘অ্যাডভার্স পজেশন ল্যান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত। ফলে সীমান্তের কাঁটাতার এখনও গ্রামের অনেকটা অংশকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
তবে সব বাধা সত্ত্বেও জামাইষষ্ঠীর আনন্দে কোনও খামতি রাখেন না গ্রামের মানুষ। অভাবের সংসার হলেও জামাই আপ্যায়নে আন্তরিকতার অভাব নেই। মাছ, মাংস, মিষ্টি আর ঘরোয়া ভালোবাসায় ভরে ওঠে শ্বশুরবাড়ি। শুধু উৎসবের শুরুটা হয় একটু অন্যভাবে, বিএসএফের অনুমতি আর পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে।
চর মেঘনার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, গ্রামের শেষ প্রান্ত দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া সরিয়ে দেওয়া হোক, যাতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছেও এই দাবি বারবার জানানো হয়েছে। তাঁদের আশা, একদিন হয়তো সীমান্তের এই কড়াকড়ি কমবে এবং জামাইষষ্ঠীর দিন আর ভোটার কার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না বাবাজীবনদের।
ততদিন পর্যন্ত চর মেঘনায় জামাইষষ্ঠীর পরিচয় একটাই, কাঁটাতারের গেট পেরিয়ে ভালোবাসার উৎসবে পৌঁছে যাওয়ার এক ব্যতিক্রমী গল্প।