কলকাতায় উদ্বোধন হল দেশের প্রথম ‘শব্দলোক’ ভাষা জাদুঘর, ভারতীয় ভাষা সংরক্ষণে জোর অমিত শাহের
কলকাতা:
কলকাতায় যাত্রা শুরু করল দেশের প্রথম ইমার্সিভ ভাষা জাদুঘর ‘শব্দলোক’ (Museum of Word)। রবিবার জাতীয় গ্রন্থাগার চত্বরে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে তৈরি এই জাদুঘরের লক্ষ্য ভারতের সমৃদ্ধ ভাষাগত ঐতিহ্য, শব্দের বিবর্তন এবং মৌখিক ও লিখিত সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে তু kolkattaলে ধরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অমিত শাহ বলেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, একটি জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। মানুষের অনুভূতি থেকে শব্দের জন্ম হয়, শব্দ থেকে ভাষার সৃষ্টি, ভাষা থেকে সংস্কৃতির বিকাশ এবং সেই সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই একটি সভ্যতার পরিচয় গড়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি এই ধারাবাহিকতাকে না বোঝে, তবে প্রকৃত অর্থে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ‘শব্দলোক’ সেই শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাতৃভাষার পাশাপাশি প্রত্যেক ভারতীয়ের অন্তত আরও একটি ভারতীয় ভাষা শেখা উচিত। এতে শুধু নিজের মাতৃভাষাই নয়, দেশের অন্যান্য ভাষাও সংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়া প্রয়োজন এবং বাড়িতে যে ভাষায় কথা বলা হয়, সেই ভাষাই শিশুর শিক্ষার প্রথম মাধ্যম হওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রতিটি ভারতীয় ভাষাকে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-সমর্থিত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন পড়াশোনা করছে তার ওপর নয়, বরং কতজন তরুণ-তরুণী গ্রন্থাগারে যাচ্ছে তার ওপর। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মকে বই, ভাষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হতে হবে।
জাদুঘরটি ঘুরে দেখার পর তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রককে পরামর্শ দেন, ভারতীয় ভাষাগুলিকে কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও ভাষাগুলির ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ বাংলার সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের কথাও স্মরণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রীঅরবিন্দের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, একটি সময়ে বিদেশি ও সংকীর্ণ মতাদর্শ বাংলার সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করেছিল। তবে তাঁর বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গ আবারও দেশের অন্যতম পথপ্রদর্শক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
জাতীয় গ্রন্থাগারে গড়ে ওঠা ‘শব্দলোক’-এর প্রথম পর্যায়ে রয়েছে ৯টি গ্যালারি। এখানে শব্দের উৎপত্তি, মাতৃভাষার গুরুত্ব, ভাষার বিবর্তন, মৌখিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, বিভিন্ন ভাষার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অবদান এবং গণগ্রন্থাগারের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধান স্বীকৃত ২২টি ভারতীয় ভাষার ইতিহাস ও বিকাশকে ডিজিটাল ডিসপ্লে, হলোগ্রাম, মোশন-সেন্সর প্রযুক্তি এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ এমন একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শব্দের উচ্চারণ, অর্থ ও ব্যবহারের পরিবর্তনের ধারাবাহিক বিবর্তন দেখা যাবে।
ভারতের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রযুক্তির মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘শব্দলোক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।