দেবকিশোর চক্রবর্তী
২ সেপ্টেম্বর—চন্দননগরের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অথচ গৌরবের দিন। ১৯৩০ সালের এই দিনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বীর বিপ্লবী মাখনলাল ঘোষাল পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রতি বছরই এই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হয়। সেই ঐতিহাসিক দিনটির স্মৃতিকে সামনে রেখে আজ চন্দননগরে আয়োজিত হল শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মরণ অনুষ্ঠান।
তৎকালীন সময়ে চন্দননগর ছিল ফরাসি শাসনাধীন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বহু বিপ্লবীর কাছে এই অঞ্চল ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শহরের গোন্দলপাড়া অঞ্চলেও বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। সেই সময় তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশের প্রধান টেগার্ট সাহেব বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে গোন্দলপাড়ায় বিপ্লবীদের ডেরায় অতর্কিতে অভিযান চালান। পুলিশের সঙ্গে বিপ্লবীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন মাখনলাল ঘোষাল।
মাখনলাল ঘোষালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে এসেছিল গোটা চন্দননগর শহরে। তাঁর আত্মত্যাগে ব্যথিত হয়ে ফরাসি শাসিত বৃহত্তর চন্দননগরের মানুষ পথে নেমে এসেছিলেন। টানা দু’দিন শোক পালন করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় অরন্ধন পালন করা হয়েছিল বলেও ইতিহাসের পাতায় উল্লেখ রয়েছে। একজন বিপ্লবীর আত্মত্যাগ কীভাবে গোটা শহরের মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল, সেই ইতিহাস আজও চন্দননগরের মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের অনুষ্ঠানে বিপ্লবী মাখনলাল ঘোষালের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ। এছাড়াও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ইতিহাসপ্রেমী মানুষ, সমাজকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়।
এই স্মরণ অনুষ্ঠানের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে যখন স্থানীয় ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের সূত্রে আমরা কথা বলেছিলাম প্রবর্তক সংঘ আশ্রমের সচিব প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি মাখনলাল ঘোষালের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে এই দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে চন্দননগরের যে গভীর যোগ রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এদিন কথা হয় বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ শক্তিপদ ভট্টাচার্যের সঙ্গেও। তিনি চন্দননগরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং মাখনলাল ঘোষালের আত্মবলিদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলি শুধুমাত্র স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।স্থানীয় ইতিহাস চর্চার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত অযন মুখোপাধ্যায়ও এদিন শহিদ মাখনলাল ঘোষালের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি চন্দননগরের মাটিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের যে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল, তার স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
শুধু মাল্যদান বা পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন নয়, এদিনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ফিরে দেখা হয় প্রায় এক শতাব্দী আগের সেই উত্তাল সময়কে। যে সময়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য তরুণ বিপ্লবীরা নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পিছপা হননি। মাখনলাল ঘোষালের আত্মবলিদান সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল ও বেদনাময় অধ্যায়।আজ, ৯৬ বছর পরেও ২ সেপ্টেম্বর চন্দননগরের কাছে তাই নিছক একটি তারিখ নয়। এটি আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত স্মারক। শহিদ মাখনলাল ঘোষালের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে আজও উচ্চারিত হয় সেই অঙ্গীকার—স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে ভুলে গেলে চলবে না, আর যাঁদের আত্মত্যাগে দেশের স্বাধীনতার পথ তৈরি হয়েছিল, তাঁদের স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে যেতে হবে।