দেব কিশোর চক্রবর্তী
বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে বেজে গেল মহারণ ২০২৬–এর দামামা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে এল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পূর্ণ নির্ঘণ্ট। দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন রাজ্যের ভোটের দিনক্ষণ। তাঁর কথায়, গণতন্ত্রের অন্যতম বড় উৎসবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় জানা গেছে, এবার রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দুই দফায়। প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হবে ২৩ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী ৬ মের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের সম্পূর্ণ ভোট প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে জ্ঞানেশ কুমার জানান, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ। তবে যাদের নাম এখনও ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বা যাদের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের সংখ্যা এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী নমিনেশন প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগের দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে বলেও তিনি জানান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ভোট হবে ১৫২টি আসনে এবং দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে ১৪২টি আসনে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন যেখানে আট দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে এবার মাত্র দুই দফায় ভোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি বিবেচনা করে যতটা সম্ভব কম দফায় নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ রাখতে এবারও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাজ্যের ১০০ শতাংশ বুথেই ওয়েব কাস্টিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। ফলে প্রতিটি বুথের ভোটগ্রহণ সরাসরি নজরদারির আওতায় থাকবে এবং যেকোনো অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
প্রথম দফার নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ ও রাজ্যের একাধিক জেলায় ভোটগ্রহণ হবে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, উত্তর দিনাজপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় এই দফায় ভোট হবে। পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও মালদা জেলার বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রেও প্রথম দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। মোট ১৬টি জেলায় প্রথম দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
এই দফায় কোচবিহারের দিনহাটা, নাটাবাড়ি ও তুফানগঞ্জ এবং আলিপুরদুয়ার জেলার কুমারগ্রাম ও কালচিনি বিধানসভা কেন্দ্রেও ভোটগ্রহণ হবে। উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোট হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে মূলত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া জেলায় এই দফায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। মোট সাতটি জেলায় দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হবে এবং এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ১৪২টি বিধানসভা আসন।
ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরই প্রশাসনিক স্তরে তৎপরতা বেড়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্য পুলিশের মধ্যে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় মোট ২৭টি স্থানে পুলিশের বদলি হয়েছে। একাধিক থানার আইসি ও সিআইকে বদলি করার নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। প্রশাসনের দাবি, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এই রদবদল করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, যত কম দফায় নির্বাচন হবে ততই ভালো। তাঁর মতে, এতে ভোট প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয় এবং একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। ভোটের কালি মুছে অন্যত্র ভোট দেওয়ার মতো ঘটনা রোধ করতেই কড়া নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ফিরহাদ হাকিম বলেন, ভোট আসবে যাবে কিন্তু মানুষ তৃণমূলের সঙ্গেই থাকবে। তাঁর দাবি, রাজ্যের মানুষ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দেবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাদের রায় প্রকাশ পাবে।
এদিকে বিজেপির পক্ষ থেকেও আত্মবিশ্বাসী সুর শোনা যাচ্ছে। দলের প্রতিনিধিদের দাবি, এবারের নির্বাচনে বিজেপি একশ শতাংশ শক্তি দিয়ে লড়াই করবে এবং বাংলায় সরকার গঠনের লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। তাদের বক্তব্য, দেশের মানুষ যেমন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশে রয়েছে, তেমনই বাংলার মানুষও এবার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে। বিজেপির দাবি, “পাবলিক মোদীর সঙ্গে রয়েছে” এবং গোটা দেশ এবার দেখবে বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের লড়াই।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহাওয়া আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রার্থী নির্বাচন, প্রচার কৌশল এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে। এখন রাজ্যের মানুষের চোখ ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের ভোটের দিকে, আর শেষ পর্যন্ত ৪ মে ঘোষিত ফলেই নির্ধারিত হবে বাংলার ক্ষমতার মসনদে কে !!