আওয়াজ-দ্য ভয়েস-এর 'দীন ও দুনিয়া' শীর্ষক পডকাস্টে সাকিব সেলিমের সঙ্গে প্রাক্তন কূটনীতিক সৈয়দ মাহমুদ আখতার
নয়া দিল্লি
ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো অন্তর্নিহিত সংঘাত নেই এবং মুসলিম সমাজের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি হতাশ হওয়া উচিত নয়, এমন মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন কূটনীতিক সৈয়দ মাহমুদ আখতার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা ও দক্ষতাই প্রকৃত অগ্রগতির চালিকাশক্তি। ‘আওয়াজ–দ্য ভয়েস’-এর ‘দীন ঔর দুনিয়া’ শীর্ষক পডকাস্টে সাকিব সেলিমের সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ভারতীয় রাজস্ব পরিষেবার (IRS) প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং পরে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আখতার ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে গণতন্ত্র, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে, এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আখতার বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্য কখনো কখনো এমন ধারণা তৈরি করে যে ইসলামিক নীতির সঙ্গে গণতন্ত্রের অসামঞ্জস্য রয়েছে অথবা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো মুসলমানদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট। তবে তিনি মনে করেন, এসব ধারণা পুরো সমাজের বাস্তব মনোভাবকে প্রতিফলিত করে না।
তিনি বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক হতাশা তৈরি হতে পারে, কিন্তু মুসলমানরা গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।”
আখতার দাবি করেন, ইসলামের ইতিহাসই আসলে পরামর্শ ও সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং প্রথম খলিফাদের সময়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সে সময় শাসনব্যবস্থা রাজতন্ত্র বা জোরজবরদস্তির ভিত্তিতে নয়, বরং পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো।
তার ভাষায়, “পারস্পরিক আলোচনা এবং জনমতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
তিনি সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের অন্ধ ব্যবহার নিয়েও সতর্ক করেন। ইন্টারনেট যেমন বিপুল জ্ঞানের সুযোগ দেয়, তেমনি ভয় ও সন্দেহ বাড়িয়ে তোলার মতো বর্ণনাও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সৈয়দ মাহমুদ আখতার
আখতার বলেন, কিছু তরুণ বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিষয়গুলো বোঝার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তব পরিস্থিতি, দুটোকেই বিবেচনা করা জরুরি।
আলোচনায় তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা মৌলানা আবুল কালাম আজাদের কথাও স্মরণ করেন। আখতার বলেন, আজাদ ভারতের জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্রের প্রতি গভীর আস্থা রাখতেন এবং তিনি বারবার বলেছেন যে ভারতের ঐক্য অবিভাজ্য, আর মুসলমানরা এই দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আলোচনার সময় আখতার তরুণদের মধ্যে একটি সাধারণ ভুল ধারণার কথাও তুলে ধরেন, অনেকে গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখেন। তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধু মুসলিম সাংসদ বা বিধায়কের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজসহ একাধিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
নিজের সরকারি অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একসময় অসামরিক প্রশাসনে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মুসলিম তরুণ-তরুণী, মহিলাসহ, এখন অসামরিক প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় যোগ দিচ্ছেন।
আখতার জোর দিয়ে বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শিক্ষা এবং পেশাগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “শুধু অভিযোগ করে পরিস্থিতি বদলানো যায় না; সমাজকেও নিজের দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।”
তার মতে, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নও সমান জরুরি। মুসলিম সমাজে এমব্রয়ডারি, হস্তশিল্প ও বিভিন্ন শিল্পকলার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এসব দক্ষতাকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘হুনার হাট’ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন, যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগরদের নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয় এবং তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাড়ায়।
কাশ্মীরে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে এক মুসলিম দম্পতি
আলোচনায় শহরাঞ্চলে মুসলমানদের পৃথক আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার বিষয়টিও উঠে আসে। আখতারের মতে, এর পেছনে একদিকে মুসলমানদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের একটি অংশের অনীহা, এই দুই কারণই কাজ করে। তিনি বলেন, এর সমাধান নিহিত রয়েছে সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার মধ্যে।
ব্যাংক ঋণ পাওয়া নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, সে প্রসঙ্গে আখতার বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ধর্ম নয়, বরং নথিপত্র, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতেই আবেদন মূল্যায়ন করে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নথি থাকলে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
নিজের দীর্ঘ সরকারি জীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে আখতার আরও বলেন, তিনি কখনোই সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে “ডিপ স্টেট” শব্দটির বাস্তব উপস্থিতি দেখেননি। অতীতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটলেও সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হতো। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম কখনো কখনো মূল ঘটনার বাইরে গিয়ে শত্রুতা ও সন্দেহের পরিবেশ আরও বাড়িয়ে তোলে।