দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাজনীতির মঞ্চে অনেকেই আসেন, অনেকেই আলোচনায় থাকেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেন। উলুবেড়িয়ার সাংসদ সাজদা সুলতানা আহমেদের জীবনযাত্রা সেই বিরল কাহিনিগুলোর অন্যতম, যেখানে এক সাধারণ নারী সমাজসেবার পথ ধরে মানুষের আস্থার প্রতীক এবং সফল জননেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
১৯৬২ সালের ২২ জুন হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন সাজদা আহমেদ। পড়াশোনা শেষ করে তিনি দীর্ঘদিন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া, বিশেষ করে নারী, শিশু ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তখনও তিনি সক্রিয় রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন না। কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার যে মানসিকতা, সেটিই পরবর্তীকালে তাঁকে জনজীবনের বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে আসে।
জীবনের এক কঠিন অধ্যায় তাঁর ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রয়াত সাংসদ ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুলতান আহমেদের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বটে, কিন্তু সরাসরি নেতৃত্বের ভূমিকায় আসার কথা হয়তো কখনও ভাবেননি। ২০১৭ সালে সুলতান আহমেদের আকস্মিক প্রয়াণে উলুবেড়িয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক শূন্যতা তৈরি হয়। সেই সময় দল ও এলাকার মানুষের প্রত্যাশা তাঁকে নতুন দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
২০১৮ সালের উলুবেড়িয়া লোকসভা উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় নবীন হলেও মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড তাঁকে দ্রুত জনসমর্থনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তিনি প্রথমবারের মতো দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় প্রবেশ করেন। সেই জয় শুধু একটি রাজনৈতিক সাফল্য ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার প্রতিফলন ছিল।
এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে উলুবেড়িয়ার মানুষ আবারও তাঁর উপর আস্থা রাখেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের জন্য সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান। এই ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে যে, তাঁর রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি দলীয় পরিচয়ের চেয়েও বেশি মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
সাজদা আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর সহজ-সরল জনসংযোগ। এলাকার গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র মানুষের সমস্যা শোনার জন্য তাঁকে নিয়মিত দেখা যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, গ্রামীণ রাস্তা এবং মহিলা ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলোকে তিনি উন্নয়নের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার চেষ্টা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারণ, মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠন এবং শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগের কথা স্থানীয় মানুষ প্রায়শই উল্লেখ করেন। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, মানবিক উদ্যোগ এবং দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি জননেত্রীর পাশাপাশি একজন মানবিক সমাজকর্মীর পরিচয়ও বহন করে চলেছেন।
অনেকের মতে, প্রয়াত সুলতান আহমেদের জনমুখী রাজনীতির ধারাকে তিনি নতুনভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। আজ উলুবেড়িয়ার বহু মানুষের কাছে তিনি শুধুমাত্র একজন সাংসদ নন, বরং তাঁদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, একজন সহজলভ্য জনপ্রতিনিধি।
একজন সাধারণ নারী থেকে সমাজসেবিকা, আর সমাজসেবিকা থেকে জননেত্রী, সাজদা সুলতানা আহমেদের এই পথচলা প্রমাণ করে যে মানুষের জন্য কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে জনসমর্থন একদিন না একদিন স্বীকৃতি দিয়েই থাকে। দেশের সংসদে তাঁর উপস্থিতি যেমন উলুবেড়িয়ার প্রতিনিধিত্ব করছে, তেমনি তাঁর জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প বহু নারীকে জনজীবনে এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণাও জোগাচ্ছে।
আগামী দিনে উলুবেড়িয়ার উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হয়, সেদিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের। তবে এতটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায়, জনসেবার মাটিতেই গড়ে উঠেছে সাজদা আহমেদের নেতৃত্বের ভিত, আর সেই কারণেই তিনি আজ উলুবেড়িয়ার মানুষের আস্থার অন্যতম প্রতীক।