শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
রাষ্ট্রপতি ভবনের গৌরবময় মঞ্চে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে পদ্মশ্রী সম্মান গ্রহণ করলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এটি শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম, সৃজনশীলতা এবং আত্মমর্যাদার এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সিনেমার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকা প্রসেনজিৎ আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যেখানে তাঁর প্রাপ্ত সম্মান সমগ্র বাঙালি সমাজের গর্বে পরিণত হয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন সময়ও এসেছে, যখন টলিউড কঠিন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক কমেছে, প্রযোজকদের অনিশ্চয়তা বেড়েছে, নতুন বিনিয়োগ থমকে গিয়েছে। সেই দুঃসময়ে একাই যেন বাংলা ছবির ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বাণিজ্যিক ছবি থেকে শুরু করে ভিন্নধর্মী ও পরীক্ষামূলক সিনেমা—সব ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন শিল্পী কেবল পর্দার নায়ক নন, তিনি একটি শিল্পমাধ্যমেরও অন্যতম রক্ষাকর্তা হতে পারেন।
১৯৬৮ সালে বাবা বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জীর ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর যাত্রা শুরু। তারপর দীর্ঘ পথচলা। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি শুধু জনপ্রিয়তার শিখরেই পৌঁছননি, নিজেকে বারবার নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। ‘মিস্টার ইন্ডাস্ট্রি’ নামে পরিচিত এই অভিনেতা বাংলা সিনেমাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছেন। তাঁর অভিনীত বহু চলচ্চিত্র বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে এবং বাংলা চলচ্চিত্রকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
প্রসেনজিতের সাফল্যের সবচেয়ে বড় দিক হল তাঁর পরিবর্তনের ক্ষমতা। এক সময়ের রোম্যান্টিক নায়ক পরবর্তীকালে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় জনপ্রিয়তায় নয়, তাঁর শিল্পসাধনায়। নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে তিনি আজও অনুপ্রেরণার নাম। অভিনয়ের পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ ও আধুনিকীকরণেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্মশ্রী সম্মান সেই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞেরই জাতীয় স্বীকৃতি। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছেন, কিন্তু দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান তাঁর কর্মজীবনের এক বিশেষ মাইলফলক। এই সম্মান যেন তাঁর শিল্পসাধনার প্রতি ভারতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।সম্মান গ্রহণের দিনেও তিনি তুলে ধরেছেন নিজের শিকড়ের পরিচয়। ফ্যাশন ডিজাইনার অভিষেক রায়ের নকশায় তৈরি বাঙালিয়ানায় ভরপুর পোশাকে তিনি উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি ভবনের অনুষ্ঠানে। সরল অথচ রুচিশীল সেই পোশাক যেন তাঁর ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন—আড়ম্বরের চেয়ে ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
এ বছরের পদ্ম সম্মানপ্রাপকদের তালিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু কৃতী ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। কিন্তু বাংলার মানুষের কাছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এই সম্মান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ তিনি কেবল একজন সফল অভিনেতা নন; তিনি একটি প্রজন্মের স্মৃতি, বাংলা চলচ্চিত্রের পুনর্জাগরণের অন্যতম মুখ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক।
আজ যখন তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত, তখন গর্বিত শুধু তাঁর পরিবার বা সহকর্মীরা নন। গর্বিত সমগ্র বাংলা। এই সম্মান প্রমাণ করে, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং শিল্পের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বীকৃতি এনে দেয়। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের পদ্মশ্রী তাই শুধু একজন অভিনেতার পুরস্কার নয়—এটি বাংলা সিনেমার অর্জন, বাংলার সংস্কৃতির অর্জন এবং প্রতিটি বাঙালির গর্বের মুহূর্ত।