রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর শুধু তার ঐতিহাসিক প্রাসাদ ও দুর্গের জন্যই নয়, ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিক শিল্পকলার অনন্য মেলবন্ধনের জন্যও বিশেষ পরিচিত। এই ঐতিহাসিক শহরের নাহারগড় দুর্গের ভেতরেই গড়ে উঠেছে জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়াম, যেখানে অতীতের ঐতিহ্য আর সমকালীন শিল্পের অসাধারণ সমন্বয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। এখানে ইতিহাস যেন নতুন এক শিল্পরূপে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আজ এই মিউজিয়াম দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এখানে এসে মানুষ তাঁদের প্রিয় ব্যক্তিত্বদের মোমের মূর্তির সঙ্গে ছবি তোলেন। তবে খুব কম মানুষই জানেন, এই অসাধারণ শিল্পভুবনের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম ও অদম্য আবেগ।
জয়পুর ওয়াক্স মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অনুপ শ্রীবাস্তব
‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় অনুপ শ্রীবাস্তব তাঁর এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রার বহু অজানা দিক তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের জগতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ১৯৯১-৯২ সালের দিকে তিনি জয়পুর ছেড়ে মুম্বইয়ে চলে যান। সেখানে চলচ্চিত্র জগতে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলতে কঠোর সংগ্রাম করেন। অভিনেতা ফিরোজ খান অভিনীত জনপ্রিয় ছবি ‘ইয়ালগার’-এর মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা হয়।
এরপর তিনি প্রকাশ ঝা, বিশাল ভরদ্বাজ এবং সলিম আখতারের মতো খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করেন। পাশাপাশি একাধিক টেলিভিশন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য লেখা, প্রযোজনা ও পরিচালনার দায়িত্বও সামলান। মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানো এই বছরগুলো তাঁকে শুধু প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতাই দেয়নি, বরং বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কৌশলও শিখিয়েছে।
বৃহৎ সেট নির্মাণ, আলোকসজ্জার সূক্ষ্মতা এবং দৃশ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের যে দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন, সেটিই পরবর্তীতে জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়ামের ভিত্তি হয়ে ওঠে। প্রতিটি বড় স্বপ্নের শুরু হয় কোনও না কোনও বিশেষ মুহূর্ত থেকে।
অনুপ শ্রীবাস্তবের জীবনেও তেমনই এক মোড় আসে ২০০৬ সালে। সে সময় জয়পুরে পিঙ্ক সিটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এর আয়োজন করা হয়েছিল। এই উৎসবে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মান জানানো।
জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়াম
এই মঞ্চেই প্রথমবার ‘শতাব্দীর মহানায়ক’ অমিতাভ বচ্চনকে সম্মানিত করা হয়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রথমবার কোনও জনসমক্ষে তাঁর জীবন্ত মোমের মূর্তি প্রদর্শিত হয়। প্রায় দশ দিনব্যাপী চলা এই উৎসবকে বিবিসি ও সিএনএনের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্যাপকভাবে কভার করেছিল।
এই উৎসব চলাকালীনই অনুপ শ্রীবাস্তবের মনে একটি নতুন ভাবনা জন্ম নেয়। তিনি ভাবেন, বিদেশে যদি বিশ্বমানের ওয়্যাক্স মিউজিয়াম থাকতে পারে, তবে ভারতে কেন নয়? তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জয়পুরেই দেশের প্রথম আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ওয়্যাক্স মিউজিয়াম গড়ে তুলবেন। তবে পিঙ্ক সিটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল শিল্পের দিক থেকে প্রশংসা পেলেও আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। এই আয়োজনের কারণে অনুপ শ্রীবাস্তবকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক লোকসান বহন করতে হয়।
এর ফলে কিছু সময়ের জন্য তাঁর স্বপ্ন থমকে যায় এবং অমিতাভ বচ্চনের সেই মোমের মূর্তিটি নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। কিন্তু এই ধাক্কাতেও তিনি হার মানেননি। আবারও চলচ্চিত্র এবং বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে তোলেন। এই সময়ে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান ও লতা মঙ্গেশকরের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অনুপ শ্রীবাস্তবকে প্রায় নয় বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত ওয়্যাক্স মিউজিয়াম ঘুরে তাদের কাজের ধরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি এমন একটি সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা শুধু বিনোদনের কেন্দ্র নয়, মানুষকে অনুপ্রাণিতও করবে। ২০১৫ সালে রাজস্থান সরকার রাজ্যে একটি বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। এ জন্য তিনটি ঐতিহাসিক স্থানের বিকল্প রাখা হয়, সিসোদিয়া রানি বাগ, বিদ্যাধর কা বাগ এবং নাহারগড় দুর্গ।
মিউজিয়ামের ভেতরের দৃশ্য
নাহারগড় দুর্গের উচ্চতা থেকে জয়পুর শহরের মনোরম দৃশ্য দেখেই অনুপ শ্রীবাস্তব সিদ্ধান্ত নেন, এই দুর্গই মিউজিয়ামের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। তখন নাহারগড় দুর্গে পর্যটকদের আনাগোনা ছিল খুবই কম এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোও প্রায় ছিল না।
স্থান নির্বাচন হওয়ার পর শুরু হয় প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। জয়পুরে এই কাজের জন্য প্রশিক্ষিত স্থানীয় কারিগর না থাকায় তিনি মুম্বই থেকে দক্ষ ভাস্কর, প্রযুক্তিবিদ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের একটি পূর্ণাঙ্গ দল নিয়ে আসেন।
ঐতিহাসিক নাহারগড় দুর্গের প্রাচীন দেয়াল ও মূল স্থাপত্যের কোনও ক্ষতি না করেই ভিতরে আধুনিক কাঠামো নির্মাণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। প্রায় নয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর ২০১৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়াম সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এই ওয়্যাক্স মিউজিয়ামটি তিনটি প্রধান গ্যালারিতে বিভক্ত। প্রতিটি গ্যালারিই দর্শকদের আলাদা ও অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। প্রথম অংশটির নাম হল অব আইকনস। এখানে খেলাধুলা, সিনেমা, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং রাজনীতির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মোমের মূর্তি প্রদর্শিত হয়েছে।
এখানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম, মহাত্মা গান্ধী, স্বাধীনতা সংগ্রামী ভগৎ সিং, মহাকাশচারী কল্পনা চাওলা, মাদার টেরেসা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শচীন তেন্ডুলকর, মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং বিরাট কোহলির মতো মহান ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের জীবন্ত প্রতিমা রয়েছে।
মিউজিয়ামের ভেতরের দৃশ্য
এছাড়াও আলবার্ট আইনস্টাইন, লিওনেল মেসি এবং জ্যাকি চ্যানের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদেরও এখানে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই গ্যালারির বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু মূর্তি প্রদর্শন করা হয়নি; ‘ওয়্যাক্স অ্যান্ড স্টোরি’ থিমের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তিত্বের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে। যেমন, ড. কালামকে রাষ্ট্রপতি ভবনের পটভূমিতে এবং কল্পনা চাওলাকে মহাকাশ অভিযানের দৃশ্যের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মিউজিয়ামের দ্বিতীয় আকর্ষণ রয়্যাল দরবার। এই অংশে রাজস্থানের গৌরবময় রাজপুত ইতিহাস এবং রাজকীয় ঐশ্বর্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে মহারাজা সাওয়াই জয় সিং, মহারানি গায়ত্রী দেবীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের মূর্তি রাজকীয় আভিজাত্যের সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বীর ব্রিগেডিয়ার ভবানি সিংয়ের প্রতিমাও রয়েছে, যা তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা জাগায়।
সমগ্র সংগ্রহশালার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রধান আকর্ষণ হলো শীশ মহল। যখন এই মিউজিয়াম তৈরি হচ্ছিল, তখন আমের দুর্গের বিখ্যাত শীশ মহল সংস্কারের কারণে পর্যটকদের জন্য বন্ধ ছিল। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই অনুপ শ্রীবাস্তব মিউজিয়ামের ভেতরেই একটি অনন্য শীশ মহল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
এটি নির্মাণ করতে প্রায় সাড়ে সাত মাস সময় লেগেছিল। মহলটি সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঠিকরি শিল্পকলা। কারিগররা প্রায় ২৫ লক্ষ ছোট ছোট কাচের টুকরো হাতে কেটে দেয়াল ও ছাদে বসিয়েছেন।
মিউজিয়ামের ভেতরের দৃশ্য
এতে আসল সোনার কারুকাজ এবং মূল্যবান ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই শীশ মহলের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর কাচের মেঝে, যা বিশ্বের অন্য কোনও শীশ মহলে দেখা যায় না। প্রথমবার আসা পর্যটকেরা এই ঝকঝকে কাচের মেঝেতে পা রাখতে গিয়েও এক মুহূর্তের জন্য ভয় পান, যদি কাচ ভেঙে যায়!
শিশুদের বিনোদনের জন্য এখানে একটি বিশেষ কিডস জোন রয়েছে। সেখানে স্পাইডারম্যান, আয়রন ম্যান, ডোরেমন এবং নোবিতার মতো জনপ্রিয় কার্টুন ও সুপারহিরো চরিত্রের মূর্তি রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি একটি রোবোটিক বাঘও রাখা হয়েছে, যার গর্জন শিশুদের রোমাঞ্চিত করে। দর্শকদের জন্য এখানে সাড়ে দশ ফুট লম্বা একটি রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেলও প্রদর্শিত হয়েছে, যার নাম রাখা হয়েছে ‘গতি গামিনী’।
একটি বাস্তবসম্মত মোম বা সিলিকনের মূর্তি তৈরি করা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। অনুপ শ্রীবাস্তব জানান, একটি মূর্তি তৈরি করতে এক থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগে। দেশের খ্যাতনামা ভাস্কর সুশান্ত রায় এই মূর্তিগুলি নির্মাণ করেছেন।
মূর্তি তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শারীরিক গঠন, মুখের অভিব্যক্তি এবং পোশাকের ধরন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ব্যক্তি জীবিত থাকলে তাঁর অনুমতি নিয়ে নিখুঁতভাবে শারীরিক মাপ নেওয়া হয়। মাটির মডেল তৈরির পর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিকে জীবন্ত করে তোলা। মহারানি গায়ত্রী দেবীর মুখের আদল নিখুঁত না হওয়ায় শিল্পীদের সেটি তিনবার পরিবর্তন করতে হয়েছিল এবং চতুর্থবারে সফলতা আসে। একটি মূর্তি তৈরির প্রাথমিক খরচই প্রায় ১০ লক্ষ টাকা।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মোমের পাশাপাশি সিলিকনের মূর্তির ব্যবহারও বাড়ছে, কারণ সিলিকনের মূর্তি বেশি টেকসই এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়ামে এই দুই ধরনের শিল্পকর্মই রয়েছে।বিদেশ থেকে তৈরি মূর্তি আমদানি করার বদলে অনুপ শ্রীবাস্তব ভারতীয় শিল্পীদের দক্ষতার ওপরই আস্থা রাখেন। তাঁর বিশ্বাস, সঠিক সুযোগ পেলে দেশের শিল্পীরাও আন্তর্জাতিক মানের শিল্পকর্ম তৈরি করতে সক্ষম।
মিউজিয়ামে নতুন মূর্তি স্থাপনের আগে দর্শকদের পছন্দ জানতে নিয়মিত সমীক্ষা করা হয়। মহেন্দ্র সিং ধোনি ও বিরাট কোহলির মূর্তি বসানোর আগে অনলাইনে ভোটাভুটিও করা হয়েছিল। এখানে একটি প্রযুক্তিগত দল নিয়মিত মূর্তিগুলির রক্ষণাবেক্ষণ, পোশাক পরিষ্কার এবং চুলের সাজসজ্জার কাজ করে।
আজ এত বড় সাফল্য অর্জনের পরও অনুপ শ্রীবাস্তবের মনে একটি অপূর্ণ ইচ্ছা রয়ে গেছে। তিনি চান, একদিন অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন নিজে এই জয়পুর ওয়্যাক্স মিউজিয়াম দেখতে আসুন। কারণ ২০০৬ সালে অমিতাভ বচ্চনের মূর্তিকেই কেন্দ্র করে এই দীর্ঘ যাত্রার সূচনা হয়েছিল।
সেই আশাতেই তিনি মিউজিয়ামে অমিতাভ বচ্চনের শ্রদ্ধেয় পিতা হরিবংশ রায় বচ্চনের প্রতিমাও স্থাপন করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, একদিন না একদিন মহানায়ক অবশ্যই এই জায়গায় আসবেন। নাহারগড় দুর্গে, জলমহলের কাছে অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্রটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।