বাংলার বাউল ঐতিহ্যের বিশ্বস্বীকৃতি, জিআই ট্যাগ পেল একতারা

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
বাংলার বাউল ঐতিহ্যের বিশ্বস্বীকৃতি, জিআই ট্যাগ পেল একতারা
বাংলার বাউল ঐতিহ্যের বিশ্বস্বীকৃতি, জিআই ট্যাগ পেল একতারা
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

একটি মাত্র তার, অথচ সেই এক তারের সুরেই যুগের পর যুগ বেজে উঠেছে বাংলার মাটি, মানুষের জীবনদর্শন আর আধ্যাত্মিকতার কথা। বাউল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, বাংলার লোকঐতিহ্যের প্রতীক একতারা এবার পেল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অন্যতম মর্যাদা— জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) ট্যাগ। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকবাদ্য শুধু আইনি সুরক্ষাই পেল না, বিশ্বের দরবারে আরও একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়।
 
একতারা কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি বাংলার বাউল দর্শনের আত্মা। গ্রামের মেঠোপথ, আখড়া, মেলা কিংবা উৎসব— শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাউল শিল্পীরা একতারা হাতে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন প্রেম, মানবতা, সাম্য এবং আত্মঅন্বেষণের গান। সেই সুরের মূর্ছনায় গ্রামীণ বাংলার গন্ধ যেমন মিশে থাকে, তেমনই ধরা পড়ে জীবনের গভীর দর্শন।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, একতারা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় লাউয়ের খোল, বাঁশ বা কাঠের দণ্ড, চামড়া এবং একটি মাত্র ধাতব তার। অত্যন্ত সাধারণ উপকরণে তৈরি হলেও এর সুরের আবেদন অসাধারণ। একটি মাত্র তার থেকেই সৃষ্টি হয় এমন এক অনুরণন, যা শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে। এই এক তারের জন্যই এর নাম হয়েছে ‘একতারা’।
 
বীরভূমের শান্তিনিকেতন, সুরুল, কেঁদুলি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও বহু দক্ষ কারিগর প্রথাগত পদ্ধতিতে একতারা তৈরি করেন। তাঁদের হাতের নিপুণতায় তৈরি এই বাদ্যযন্ত্র শুধু বাংলার বিভিন্ন প্রান্তেই নয়, দেশের বাইরেও পৌঁছে যাচ্ছে। দেশ-বিদেশের বহু শিল্পী ও সংগ্রাহকের কাছেও একতারা আজ বিশেষ আকর্ষণের বস্তু।
 
সময়ের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই সঙ্গীতের ধরণেও এসেছে পরিবর্তন। তবুও একতারা তার স্বকীয়তা হারায়নি। বরং বাংলার বাউল শিল্পীদের হাত ধরে এই বাদ্যযন্ত্র পৌঁছে গিয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান-সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাউল গানের সঙ্গে একতারার অনন্য সুর বিদেশি শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করেছে।
 
সংস্কৃতিবিদদের মতে, জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে একতারার ঐতিহ্যগত পরিচয় আরও সুসংহত হবে। এর ফলে প্রকৃত কারিগরদের স্বার্থ রক্ষা হবে, নকল পণ্যের প্রবণতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলার এই লোকবাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে একতারা নির্মাণ ও বাউল সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
 
বাংলা ইতিমধ্যেই একাধিক ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও হস্তশিল্পের জন্য জিআই স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল একতারা। এই স্বীকৃতি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের প্রাপ্তি নয়; এটি বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউল দর্শন, গ্রামীণ শিল্পচর্চা এবং শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
 
বাংলার মাটির গন্ধ, মানুষের জীবনদর্শন এবং সুরের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে চলা একতারা তাই আজ শুধু বাউলের সঙ্গী নয়, গোটা বাংলার সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক। জিআই ট্যাগ সেই গর্বকে আরও একধাপ উঁচুতে পৌঁছে দিল।


শেহতীয়া খবৰ