হিজাব ছাড়া গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ ৭৪ বেত্রাঘাত! ইরানি গায়িকা পারস্তু আহমাদিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ
তেহরান:
একবিংশ শতাব্দীতেও শিল্পচর্চা এবং নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরান। হিজাব ছাড়া অনলাইন কনসার্টে গান গাওয়ার অভিযোগে ইরানি গায়িকা পারস্তু আহমাদি এবং তাঁর প্রযোজনা দলের আট সদস্যকে ৭৪টি করে বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছে ইরানের একটি আদালত। সেই সঙ্গে দুই বছরের জন্য বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা এবং শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত যে কোনও কর্মকাণ্ড থেকেও তাঁদের বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি কনসার্টে দেশাত্মবোধক গান ‘আজ খুনে জাওয়ানানে ওয়াতান’ পরিবেশন করেছিলেন পারস্তু আহমাদি। কালো স্লিভলেস পোশাক এবং মাথায় হিজাব ছাড়া তাঁর সেই পরিবেশনা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মাস পর সেই কনসার্টকেই “অশ্লীল ও অনৈতিক বিষয়বস্তু” আখ্যা দিয়ে মামলা দায়ের করা হয়।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন গায়িকার বিরুদ্ধে নয়, বরং ইরানে শিল্পী সমাজ ও নারীদের স্বাধীন কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে বৃহত্তর দমননীতির প্রতিফলন। সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরানের বাহার গন্দেহারি বলেন, “একটি গান গাওয়ার জন্য বেত্রাঘাতের মতো শাস্তি প্রমাণ করে, ইরানে সংস্কার ও উদারতার যে ছবি তুলে ধরা হয়, বাস্তব পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।”
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী মাসিহ আলিনেজাদ এই ঘটনাকে “নারীদের বিরুদ্ধে জেন্ডার অ্যাপারথাইডের আরেকটি উদাহরণ” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, “একজন নারী কিভাবে পোশাক পরবেন বা গান গাইবেন, তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর স্বাধীন অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে।”
মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজেলির দাবি, ইরানের প্রচলিত আইনে নারীদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ নয়। তাঁর মতে, “আইনের ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শিল্পীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে মহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে নারীদের স্বাধীনতা ও বাধ্যতামূলক হিজাব-বিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। পারস্তু আহমাদির ঘটনাও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ। অনেকের মতে, সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্র একটি বার্তা দিতে চাইছে।
অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই রায়ের তীব্র নিন্দা করেছে। বিভিন্ন সংগঠনের মতে, শিল্প, সঙ্গীত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারস্তু আহমাদির বিরুদ্ধে এই শাস্তি শুধু একজন শিল্পীর বিচার নয়, বরং আধুনিক সমাজে সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলমান সংঘাতেরই এক নতুন অধ্যায়।