কলকাতা ঃ
শিক্ষক দিবসে দেশের ৪৮ জন কৃতী স্কুলশিক্ষককে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার ২০২৬-এ সম্মানিত করা হবে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন। জেলা, রাজ্য ও জাতীয় স্তরে তিন ধাপের বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ৪৮ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন পুরুষ ও ২২ জন মহিলা।
এবার বাংলার জন্য বিশেষ গর্বের খবর—পশ্চিমবঙ্গ থেকে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন দুই শিক্ষক। ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম ব্লকের বড়নিগুই এলাকার গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলের ভূগোল শিক্ষক শান্তনু পাত্র এবং পূর্ব বর্ধমানের বর্ধমান শহরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রী রামকৃষ্ণ সারদা বিদ্যাপীঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পলাশ চৌধুরী। সরকারি তালিকাতেও তাঁদের নাম রয়েছে।
৩৮ বছরের শান্তনু পাত্রের আদি বাড়ি তারকেশ্বরে। গত আট বছর ধরে তিনি নয়াগ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর কাছে এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বরং ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠা ও শেখার আগ্রহের স্বীকৃতি। প্রত্যন্ত এলাকার পড়ুয়াদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে তাঁদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজই তাঁর শিক্ষকতার অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানের পলাশ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন। তাঁর নামও দেশের ৪৮ জন নির্বাচিত শিক্ষকের তালিকায় রয়েছে।
ছত্তীসগঢ় থেকে সুজাতা নয়, সুদীর্ঘ কাজের স্বীকৃতি সুनीতা যাদবের
ছত্তীসগঢ় থেকেও জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন সুনীতা যাদব। তিনি সারঙ্গড়-বিলাইগড় জেলার গভর্নমেন্ট মিডল স্কুল, খিচড়ি-তে কর্মরত। সরকারি তালিকায় তাঁকে ছত্তীসগঢ়ের একমাত্র নির্বাচিত স্কুলশিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর শিক্ষাদানের কাজে প্রযুক্তি ও কার্যকর শেখার পদ্ধতির ব্যবহার নিয়েও তাঁর নিজস্ব শিক্ষামূলক উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর শিক্ষা-সংক্রান্ত অনলাইন সামগ্রীতেও স্কুলের কার্যকর মডেল ও শিক্ষার্থীদের শেখার বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।
ত্রিপুরায় জাতীয় স্বীকৃতি রঞ্জন দেবনাথের
ত্রিপুরা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুমের পিএম শ্রী সাবরুম গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের রঞ্জন দেবনাথ। তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় ত্রিপুরার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে।
রঞ্জন দেবনাথের নেতৃত্বে সাবরুমের এই স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, খেলাধুলা এবং ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্কুলটিতে প্রায় ৭০০ পড়ুয়ার জন্য মাত্র ১৭ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ভালো ফলাফল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য স্কুলটিকে নজরে এনেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল শ্রেণিকক্ষে প্রচলিত ‘সামনের বেঞ্চ-পিছনের বেঞ্চ’ ধারণা বদলে ইউ-আকৃতির বসার ব্যবস্থা চালু করা। এর ফলে শিক্ষক ও পড়ুয়াদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং প্রত্যেক পড়ুয়াকে সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
৪৮ জনের তালিকায় দেশের বৈচিত্র্য
২০২৬ সালের জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের তালিকায় ২৭টি রাজ্য, ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ছ’টি সংস্থার শিক্ষক রয়েছেন। সরকারি স্কুলের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, নবোদয় বিদ্যালয়, সৈনিক স্কুল, একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় এবং অন্যান্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকও রয়েছেন।
জাতীয় শিক্ষক পুরস্কারের মূল লক্ষ্য হল এমন শিক্ষকদের সম্মান জানানো, যাঁরা নিষ্ঠা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে শুধু শিক্ষার মান উন্নত করেননি, পড়ুয়াদের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন।
বাংলার শান্তনু পাত্র ও পলাশ চৌধুরী থেকে ছত্তীসগঢ়ের সুনীতা যাদব কিংবা ত্রিপুরার রঞ্জন দেবনাথ—প্রত্যন্ত ও স্থানীয় স্তরে শিক্ষার ভিত শক্ত করা এই শিক্ষকদের জাতীয় স্বীকৃতি আরও একবার মনে করিয়ে দিল, দেশের শিক্ষার প্রকৃত পরিবর্তন অনেক সময় শুরু হয় শহরের বড় প্রতিষ্ঠানে নয়, ছোট ছোট স্কুলের শ্রেণিকক্ষ থেকেই।