শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের কাজ সেরে বই-খাতা গুছিয়ে নিতেন দুই বোন। তারপর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের পথে হাঁটা। গন্তব্য কোনও স্কুল বা কলেজ নয়। জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের ঢাল। সেখানে পৌঁছে মোবাইলের স্ক্রিনে সিগন্যালের দাগ খুঁজে নিতেন তাঁরা। নেটওয়ার্ক মিললেই শুরু হতো পড়াশোনা। কখনও অনলাইন ক্লাস, কখনও নিজের পড়া, কখনও আবার একে অপরকে বুঝিয়ে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হল ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের মহুলপঙ্খা গ্রাম। এই গ্রামের যজ্ঞসেনী ও দিব্যসেনী খাতুয়ার কাছে এটাই ছিল চিকিৎসক হওয়ার প্রস্তুতি।
শহরের পড়ুয়াদের মতো নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানে বসে পড়ার সুযোগ ছিল না তাঁদের। বাড়িতে নেটওয়ার্ক নেই। অনলাইন ক্লাস করতে হলে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। সেই বাধাকে মেনে নিয়ে প্রতিদিন পাহাড়ে ওঠার অভ্যাস তৈরি করেছিলেন দুই বোন। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কোনও ঋতুই তাঁদের পড়ার রুটিন বদলাতে পারেনি। পাহাড়ের ঢাল, জঙ্গলের নির্জনতা আর মোবাইলের সামান্য সিগন্যালই হয়ে উঠেছিল তাঁদের পড়াশোনার অবলম্বন।
বড় বোন যজ্ঞসেনীর লড়াই শুরু হয়েছিল আরও আগে। নিট পরীক্ষায় প্রথম দু’বার সাফল্য আসেনি। কিন্তু ব্যর্থতা তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তৃতীয়বারের চেষ্টায় নিট ২০২৬-এ সফল হন তিনি। সেই প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা ছোট বোন দিব্যসেনীর পড়াশোনায় কাজে লাগে। কোন বিষয় কীভাবে পড়তে হবে, কোথায় ভুল হচ্ছে, কীভাবে প্রস্তুতি আরও ভালো করা যায়, দু’জনে আলোচনা করতেন। দিদির ব্যর্থতা ছোট বোনের কাছে হয়ে উঠেছিল শেখার সুযোগ, আর ছোট বোনের আগ্রহ দিদিকে দিয়েছিল নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ।
দিব্যসেনী প্রথমবার নিট পরীক্ষা দিয়েই সফল। দুই বোনের এই সাফল্যের পিছনে কোনও ব্যয়বহুল কোচিংয়ের গল্প নেই। আছে নিয়মিত পড়াশোনা, নিজেদের মধ্যে আলোচনা এবং দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। পড়ার পরিবেশ অনুকূল না হলেও তাঁরা পড়া থামাননি। বরং প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেদের প্রস্তুতিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
তাঁদের বাবা গৌরাঙ্গ চাষবাস করেন। মা সুনীতা অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা। নিম্নবিত্ত পরিবারের দুই মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল বড় বাধা। শহরে গিয়ে কোচিং নেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও পড়াশোনার ইচ্ছায় ঘাটতি ছিল না। মোবাইল ফোনের সাহায্যে অনলাইন ক্লাস করা, নিজেদের পড়া তৈরি করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল তাঁদের ভরসা।
তবে পাহাড়ে ওঠার এই গল্প শুধু নেটওয়ার্ক খোঁজার গল্প নয়। প্রতিদিনের শ্রমকে পড়াশোনার অংশ করে নেওয়ার গল্পও। ক্লাস করার জন্য হাঁটা, সিগন্যালের অপেক্ষা করা, দীর্ঘক্ষণ পড়ায় মনোযোগ ধরে রাখা, সবকিছুর মধ্যেই ছিল চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে অবিচল থাকার চেষ্টা। একদিনের পরিশ্রমে সাফল্য আসেনি। বহুদিনের অভ্যাস, অনুশীলন ও ধৈর্য ধীরে ধীরে তাঁদের সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।
দুই বোনের সাফল্য তাই শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার খবর নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, সুযোগের অভাব থাকলেও অধ্যবসায় থাকলে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা যায়। যজ্ঞসেনীর তৃতীয় প্রচেষ্টা এবং দিব্যসেনীর প্রথম প্রচেষ্টা, দুটি আলাদা অভিজ্ঞতা মিলেছে একই স্বপ্নে। একজনের দীর্ঘ লড়াই অন্যজনকে সাহস দিয়েছে। আর দু’জনে মিলে প্রমাণ করেছেন, সাফল্যের পথে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসও সমান শক্তি।
মহুলপঙ্খার সেই পাহাড়ের ঢালে এখনও হয়তো মোবাইলের সিগন্যাল খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু দুই বোনের স্বপ্ন এখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। সামনে মেডিক্যাল কলেজ, কঠিন পড়াশোনা এবং চিকিৎসক হওয়ার দীর্ঘ পথ। সেই পথেও তাঁদের সঙ্গী থাকবে এতদিনের শ্রম, অধ্যবসায় এবং একে অপরকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।