জয়পুর
প্রতিভার ঘনত্বে ভরা কোটা শহরে যেখানে প্রতিযোগিতার চাপ আর সাফল্যের দৌড় প্রতিদিনের ঘটনা, সেখানে মাহরুফ আহমেদ খান ও মাসরূর আহমেদ খান- এই যমজ ভাইদের গল্প আলাদা নজর কাড়ে। যেন নিখুঁত সামঞ্জস্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। একই জুতো সাইজ, একই চশমার পাওয়ার, আর এবার একই পরীক্ষা, একই শিফট, এমনকি একই ফলাফল। JEE মেইন (সেশন–১), ২০২৬-এ দু’জনেই পেয়েছেন ৩০০ এর মধ্যে ২৮৫ নম্বর, যা এনটিএ স্কোর হিসেবে ৯৯.৯৯৮।
NTA-র নিয়ম অনুযায়ী, যমজ প্রার্থীদের ফরমে উল্লেখ করতে হয় যে তারা একসঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে JEE বা NEET-এ র মতো পরীক্ষায় তাদের একই শিফটে বসানো হয়, যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। ওডিশার ভুবনেশ্বরে শুরু হওয়া তাদের শিক্ষাযাত্রা ২০২৩ সালে এসে থামে কোটা’র প্রতিযোগিতামুখর করিডোরে, অসংখ্য JEE-স্বপ্নের মতোই।
অলিম্পিয়াড পরীক্ষায় আগে থেকেই পারদর্শী এই দুই ভাই ভেবেছিলেন, কোটা’র প্রশিক্ষণ পরিবেশ বড় পরীক্ষার জন্য তাদের আরও শাণিত করবে। এভাবেই দু’জনের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা রূপ নেয় পূর্ণকালীন পড়াশোনার কৌশলে।
অ্যালেন ক্যারিয়ার ইনস্টিটিউটের ক্যারিয়ার কাউন্সেলর অধ্যাপক অমিত আহুজা বলেন, “জন্ম ৭ মে ২০০৮, একই তারিখে জন্ম নেওয়া এই দুই ভাই যতদূর তারা মনে করতে পারে সবকিছুই পাশাপাশি করেছে, একই স্কুল, একই কোচিং, একই লক্ষ্য। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে নোট, সবই তারা এক ছন্দে ভাগ করে নিয়েছে।”
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পেছনে ছিল পরিবারের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ওডিশা সরকারের অধীনে ১৯৯০-এর দশক থেকে কর্মরত গাইনোকোলজিস্ট ডা. জিনাত বেগম কোটা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজের চাকরি স্থগিত রেখে ছেলেদের ভবিষ্যতের জন্য পাশে দাঁড়ান। টানা তিন বছর তিনি সামলেছেন তাদের প্রতিদিনের রুটিন, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যের খেয়াল এবং মানসিক চাপ, উচ্চচাপের এই প্রস্তুতি-জগতে তিনি ছিলেন তাদের নীরব শক্তি।
জিনাত জানান, কোটা যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল মূলত অস্থায়ী। “২০২৩ সালে দু’জনেই ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স অলিম্পিয়াডে নির্বাচিত হয়। মার্চে আমরা কোটা আসি ধারণা ছিল কয়েক মাস থাকবো। কিন্তু কিছুদিন পরই ওরা বলে, এখানকার পড়ার পরিবেশ ও পদ্ধতি তাদের ভালো লেগেছে। এরপরই তারা JEE প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নেয়,” তিনি বলেন। তিনি আরও বলেন “আমি ভেবেছিলাম, যদি তাদের ক্যারিয়ার তৈরি হয়, আমি আবার নিজের কাজ শুরু করতে পারব। কিন্তু এই পর্যায়ে ওদের পাশে থাকা আমার কাছে সবচেয়ে জরুরি,”।
কোচিং একাডেমিতে গিয়ে যমজরা উপলব্ধি করে, অন্যকে হারানো নয়, বরং একে অপরকে আরও ভালো করতে উদ্বুদ্ধ করাই তাদের বিশেষত্ব। একজন ভুল করলে অন্যজন সেই জায়গা পূরণ করতো, ভুল বিশ্লেষণ, ধারণা পুনরাভ্যাস, লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ, সবই চলতো দলবদ্ধভাবে। বাড়িতেও প্রতিযোগিতা থাকতো, তবে তা সীমাবদ্ধ থাকতো কেবলমাত্র নিজেদের মধ্যে। জিনাত জানান, তারা একে অপরকে “বন্ধু” এবং “আয়না” হিসেবে দেখে।
তিনি বলেন “ওরা একসঙ্গে পড়ত, একসঙ্গে পরীক্ষা দিত এবং নিজেদের স্কোর তুলনা করতো, পূর্বের ফলাফলের সঙ্গেও মিলিয়ে দেখত। এতে ওদের দুর্বলতা ধরা পড়ত, আর ওরা সেটি কাটিয়ে উঠতে কাজ করত। এই পারস্পরিক প্রতিযোগিতাই ওদের সবচেয়ে বড় শক্তি,”।