আবাসনের উঠোনে বিজ্ঞানচর্চার বিপ্লব, উদ্যোগে অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালা তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালা তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
 
মৃদগন্ধা দীক্ষিত

সাধারণত, পুনে কিংবা অন্য যেকোনও শহরের কোনও আবাসনের ভেতরে সন্ধ্যার সময় উঁকি দিলে কী দৃশ্য চোখে পড়ে? অফিস থেকে ফেরা গাড়ির ভিড়ে ব্যস্ত পার্কিং এলাকা, বেঞ্চে বসে গল্পে মশগুল প্রবীণরা, আর খোলা জায়গায় ছোটাছুটি ও চিৎকারে মেতে থাকা শিশুদের দল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই খেলাধুলায় মগ্ন শিশুদের সংখ্যাও কমে এসেছে। কারণ, বহু শিশু এখন ঘরের ভেতরে বন্দি হয়ে মোবাইল বা টিভির পর্দায় চোখ আটকে বসে থাকে। এই দৃশ্য যতই পরিচিত ও দৈনন্দিন হোক না কেন, কিছু আবাসনে সন্ধ্যা নামলেই ঘটে এক অন্যরকম ঘটনা। সেখানে শিশুরা হাতে নিয়ে ঘোরে প্লাস্টিকের বোতল, সুতো, বেলুন কিংবা কখনও চুম্বকের টুকরো। শুরু হয় এক ভিন্ন ধরনের খেলা, যেখানে ধীরে ধীরে খুলে যায় বিজ্ঞানের এক নতুন জগৎ।
 
এই অভিনব ও অনুপ্রেরণাদায়ক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের মূল স্থপতি হলেন অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালা। চারপাশে চলতে থাকা মুখস্থনির্ভর শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আবাসনের উঠোনেই শিশুদের মনে জাগিয়ে তুলছেন স্বাভাবিক কৌতূহল।
 
 
উঠোনের বেঞ্চেই পরীক্ষাগার
 
আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের মতো আকর্ষণীয় বিষয়ও অনেক সময় শুধুই নম্বর পাওয়া ও মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। “নিউটনের সূত্র কী?”, এই প্রশ্নের উত্তর শিশুরা অনর্গল বলতে পারলেও, সেই সূত্র দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে গিয়ে তারা হোঁচট খায়। এই সমস্যাটিকেই চিহ্নিত করে লোকহান্ডওয়ালা স্যার আবাসনগুলিতে শিশুদের জন্য শুরু করেন ‘অ্যাক্টিভিটি-বেসড লার্নিং’। তিনি ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের ‘অ্যাক্টিভিটি-বেসড লার্নিং’-এর একজন সরকারি প্রশিক্ষকও।
 
এই ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলির গুরুত্ব নিয়ে স্যার বলেন, “বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য পরীক্ষায় নম্বর তোলা নয়, বরং চারপাশে ঘটে চলা ঘটনাগুলিকে কৌতূহল ও যুক্তির দৃষ্টিতে দেখা। শিশুদের হাতে দামি যন্ত্র তুলে দেওয়ার বদলে, বাড়ির সাধারণ বাতিল জিনিস দিয়ে যখন কোনও বৈজ্ঞানিক নিয়ম প্রমাণ করা হয়, তখন তা তাদের মনে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। পরীক্ষাগার কোনও বন্ধ ঘরের মধ্যে থাকা উচিত নয়; সেটি থাকা উচিত আবাসনের উঠোনে এবং শিশুদের হাতের মুঠোয়।”
 
বিভিন্ন আবাসনের মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মশালার আয়োজন করেন। শিশুরা তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়। স্যারের হাতে থাকে না কোনও মোটা বই। তাঁর কাছে থাকে সাধারণ কিছু জিনিস। একটি ছোট স্ট্র ও খালি বোতলের সাহায্যে তিনি শিশুদের বোঝান বায়ুচাপ কীভাবে কাজ করে। দুটি সাধারণ আয়না দিয়ে খেলতে খেলতে শেখানো হয় আলোর প্রতিফলনের নিয়ম। খেলার মধ্য দিয়েই শিশুরা শিখতে শুরু করে মাধ্যাকর্ষণ, গতি ও শক্তির সূত্র। এখানে ‘ঠিক’ বা ‘ভুল’-এর কোনও ভয় নেই। শিশুদের প্রশ্ন করার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।
 
স্যার জোর দিয়ে বলেন, “যখন কোনও শিশু প্রশ্ন করে, ‘এটা এমন কেন?’ সেখান থেকেই আসল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার শুরু।” কর্মশালার পর সেই আবাসনে গড়ে তোলা হয় একটি ‘সায়েন্স ক্লাব’। সেটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সেখানকার আগ্রহী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রশিক্ষণ দেন। প্রত্যাশা থাকে, ক্লাবটি প্রতি মাসে অন্তত একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম শিশুদের সঙ্গে করবে।
 
যখন ছাদের ওপর নেমে আসে আকাশ...
 
এই উদ্যোগ শুধু পৃথিবীর বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তা পৌঁছে যায় সরাসরি আকাশ পর্যন্ত।জ্যোতির্বিজ্ঞান এমন একটি বিষয়, যা লোকহান্ডওয়ালা স্যারের হৃদয়ের খুব কাছের। তিনি ভারতের প্রাচীনতম ও খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা ‘জ্যোতির্বিদ্যা পরিষদ’-এর প্রাক্তন সভাপতি। তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বেশি সুফল পায় এই ছোট ছোট শিশুরাই।
 
সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে এবং আকাশে একে একে তারা জ্বলতে থাকলে, শুরু হয় এই উদ্যোগের দ্বিতীয় পর্ব। অনেক সময় আবাসনের ছাদেই বসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্লাস। শিশুরা যখন প্রথমবার দূরবীন দিয়ে চাঁদের গর্ত কিংবা বৃহস্পতির উপগ্রহ দেখে, তখন তাদের চোখে যে বিস্ময় ও কৌতূহলের ঝিলিক ফুটে ওঠে, তা যেকোনও বইয়ের জ্ঞানের চেয়েও অনেক বড়। সপ্তর্ষিমণ্ডল কোথায়, ধ্রুবতারা কীভাবে চিনতে হয়, কৃত্তিকা নক্ষত্রমণ্ডলী দেখতে কেমন, এসব গল্পের মতো করে বোঝান স্যার। ফলে, যে শিশুরা আগে আকাশের দিকে তাকাতই না, তারাই এখন নিখুঁতভাবে নক্ষত্রের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে।
 
অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালা তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
 
আকাশের সঙ্গে এই সম্পর্ক নিয়ে স্যার বলেন, “আকাশের দিকে তাকানো মানে শুধু নক্ষত্রপুঞ্জের নাম মুখস্থ করা নয়। এর অর্থ হল এই অসীম মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থানটা বোঝা। যখন কোনও শিশু দূরবীন দিয়ে আকাশের বিস্ময় দেখে, তখন তার মুখে যে আনন্দ আর উপলব্ধির ছাপ ফুটে ওঠে, তা অসাধারণ।”
 
অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার
 
এই উদ্যোগ এত সফল হওয়ার পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে সামনে আসে লোকহান্ডওয়ালা স্যারের ব্যক্তিত্ব। তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.ই. ডিগ্রিধারী। এছাড়াও, তিনি ১৮ বছর ধরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি একাধিক বড় সংস্থার সিইওদের ‘মেন্টর’ হিসেবে কাজ করছেন। তবুও, আবাসনের কোনও পঞ্চম শ্রেণির শিশুর সরল প্রশ্নের উত্তরও তিনি একই আন্তরিকতা ও গুরুত্ব দিয়ে দেন।
 
আজকের পরিবর্তিত জীবনযাপন নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বলি আজকের প্রজন্ম পর্দার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের জন্য সমান আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণমূলক কোনও বিকল্প তৈরি করেছি? বিজ্ঞানের এই খেলাগুলো শিশুদের মোবাইল থেকে দূরে এনে প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কাজ করছে।”
 
এই উদ্যোগ শুধু শিশুদের ওপরই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, বরং পুরো আবাসনের পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। যেসব অভিভাবক প্রথমে শুধু দেখতে এসেছিলেন তাঁদের সন্তানরা কী করছে, তাঁরাও এখন নিজেরা এই পরীক্ষাগুলির প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন। আবাসনের অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতোই এখন এই ‘সায়েন্স কাট্টা’ও মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ছুটির দিনে কোন মলে যাওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা না করে, শিশুরা এখন স্যারের সঙ্গে কোন নতুন পরীক্ষা করা যায় তা নিয়েই আলোচনা করে।
 
আশার এক ছবি
 
আজ আমরা দেখছি, নগরায়ণের ফলে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অনেকেই জানেন না পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকেন। এমন সময়ে অধ্যাপক মুজতবা লোকহান্ডওয়ালার মতো উচ্চশিক্ষিত ও পরীক্ষাধর্মী একজন মানুষের এই উদ্যোগ সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। চারপাশে যখন কুসংস্কার ও ভণ্ড ধর্মগুরুর বাড়বাড়ন্ত, তখন শিশুদের মধ্যে ‘বৈজ্ঞানিক মনোভাব’ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সেই দিক থেকেও তাঁর কাজ বিশেষ স্বীকৃতির দাবি রাখে।
 
বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যখন এমন মুক্ত, অনানুষ্ঠানিক ও পরীক্ষানির্ভর পরিবেশ যুক্ত হয়, তখনই প্রকৃত গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষের জন্ম হয়। আজ আবাসনের এই ‘বিজ্ঞানের বাগান’-এ যে কৌতূহলের বীজ বপন করা হচ্ছে, তা একদিন নিঃসন্দেহে বিশাল বৃক্ষে পরিণত হবে।