রাঁচির সাত বছর বয়সী বালক ইশাঙ্ক পক প্রণালী অতিক্রম করে ইতিহাস গড়েছে, পেল ইউনিভার্সাল রেকর্ড ফোরাম থেকে স্বীকৃতি
শান্তিপ্রিয় রায় চৌধুরী
রাঁচির ঝাড়খণ্ডের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া সাত বছর বয়সী বিস্ময় সাঁতারু হলেন ইশাঙ্ক সিং। এই ছোট্ট ছেলেটি কয়েক দিন আগে শ্রীলঙ্কার তালাইমান্নার থেকে ভারতের ধানুশকোডি পর্যন্ত প্রায় ২৯ কিলোমিটার (১৯ মাইল) বিপজ্জনক পক প্রণালী মাত্র ৯ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে সাঁতরে অতিক্রম করে সে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে এক ইতিহাস তৈরি করেছে। সমুদ্রের প্রতিকূল স্রোত ও বিশাল ঢেউয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই সে এই দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেছেন।
এই অবাক কান্ডটি ঘটানো ছেলেটি কে? কী ভাবে সে উঠে এল। তা একবার পিছন ফিরে তাকানো যাক। ৩০ এপ্রিল ভোরে ইশাঙ্ক সমনন্দরের অংশ হিসাবে শ্রীলঙ্কা ভারতের মধ্যবর্তী দূর্গম সমুদ্রপথে দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু করে। সমুদ্রের ঢেউ আর প্রবল স্রোতকে জয় করে সেদিন বিকেলের মধ্যেই পক প্রণালী অতিক্রম করেছে সাত ঘন্টায়। মান্নার থেকে ইশাঙ্ক প্রথম ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার নৌ বাহিনীর পাহারায় থাকার পর ভারতীয় উপকূল রক্ষী বাহিনী তার বাকি পথের প্রতিটি সাঁতারের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করেছিল। একইসঙ্গে আরো একটি সহযোগী দল আবহাওয়া পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল। এতকিছু থাকার পরেও স্রোত ইশাঙ্ককে শ্রীলংকার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু খুবই বিস্ময়ের ব্যাপার ছোট্ট এই ছেলেটি হার মানেনি। বিপদজনক পক প্রণালীর সব বাঁধা টপকে ভারতের ধনুসকোটিতে পৌঁছায় মাত্র ৯ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে।
এই ২৯ কিমি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ সাঁতার হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে সে। আর তার এই কৃতিত্বের জন্য 'ইউনিভার্সাল রেকর্ডস ফোরাম' তাকে সর্বকনিষ্ঠ পথ প্রণালী অতিক্রম কারীর খেতাব দিয়েছে। এছাড়া ফেনীর 'ওপেন ওয়াটার সুইমিং একাডেমি'ও তাকে 'ওস্যাট ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ২০২৬' সম্মান দিয়েছে। সে ভেঙে দিয়েছে ভারতের যশোবন্তের রেকর্ড। যে রেকর্ডটি হয়েছিল ২০১৯ সালে। ১০ বছর বয়সে ১০ ঘন্টা ৩০ মিনিটে এই সাঁতার শেষ করেছিল যশোবন্ত।
রাঁচি শহরের ধুরওয়াজ গ্রামের গরিব পরিবারের ছেলে ইশাঙ্ক। তার গ্রামের প্রতিবেশীরা আদর করে তার নাম দিয়েছে 'ওয়াটার বেবি'। ঈশাঙ্কের বাবা সুনীল কুমার সিং রাঁচিতে বৈদ্যুতিক সামগ্রিক ঠিকাদারি ব্যবসা করেন। ছেলে পক প্রনালী অতিক্রম করবে। ছেলের এই শখ মেটাতে তিনি অনেক কষ্ট করে শ্রীলংকা যাওয়া, সাঁতারের সময় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এবং সরকারি অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড় করেছিলেন।
ছেলে সাঁতার কেটে বড় হবে, তাই ছেলের ইচ্ছাকে পূরণ করার জন্য ইশাঙ্কের মা মনীষা সিং ছেলের সাঁতারের জন্য সবকিছু দেখাশোনা করেছেন। ছেলের বয়স যখন পাঁচ, জলে তার সাঁতার কাটার প্রবণতা দেখে তখন থেকেই মা ছেলেকে সাতারে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। অনুশীলনের জন্য ড্রিল কঠিন রুটিন মেনে চলতে হতো। সবকিছুই মা ধৈর্য সহকারে ছেলের জন্য সংসারের কাজ ফেলে করে গেছেন।
ইশাঙ্ককের দুজন প্রশিক্ষক আমান কুমার জয়সওয়াল ও বজরং কুমার। তারা তাকে প্রস্তুতির জন্য দৈনিক সাঁতারের সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। দীর্ঘ দূরত্বের সাঁতারের জন্য তৈরি করতে ইশাঙ্ক প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা অনুশীলন করত।
কোচ আমানের কথায়, ইশাঙ্ক বরাবরই আত্মবিশ্বাসী। প্রতিটি কাজ ও শৃংখলার সঙ্গে করে। ঈশ্বর ওকে প্রতিভা দিয়েছেন,তাই যে কাজগুলো তাকে দেয়া হতো অল্প সময়ের মধ্যেই সে করতে পারত। বয়স কোন ব্যাপারই নয় তার কাছে।" আমান মনে করেন, 'তার ছাত্রের এই সাফল্য অনেক শিশুকে সাঁতার ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে উৎসাহিত করবে এবং আগামী প্রজন্মদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।'
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন ইশাঙ্ককের সাফল্যে অভিভূত। তিনি বলেছেন, 'ইশাঙ্কের এই সাফল্য শুধু ঝাড়খন্ড নয়, সমগ্র দেশের গর্ব। শৃঙ্খলা ও নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচলনিষ্ঠার এক অসাধারণ উদাহরণ।'
এত সাফল্যের পরেও কিন্তু ইশাঙ্ক কোন বড় প্রতিযোগিতাতে নামতে পারবে না। কারন তার বয়স এখন মাত্র ৭। কিন্তু ওসব শোনার পাত্র নয় ইশাঙ্ক। সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে এবার ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার। দারুন একটা মনোবল নিয়ে সে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে আবার প্রমাণ করতে চায় বয়স কোন ব্যাপার নয়!